স্পোর্টস ডেস্ক: জুন মাস সাধারণত ঢাকার ফুটবল জার্সির বাজারে তুলনামূলক ধীরগতির সময়। তবে প্রতি চার বছর পরপর ফুটবল বিশ্বকাপের মৌসুম এলেই রাজধানীর গুলিস্তান এলাকার মওলানা ভাসানী জাতীয় হকি স্টেডিয়ামসংলগ্ন মার্কেটগুলো পরিণত হয় দেশের অন্যতম বড় ক্রীড়া পোশাকের বাজারে।
বাংলাদেশের বিশ্বকাপ জার্সির বাজার নিয়ে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে স্প্যানিশ দৈনিক মুন্ডো দেপোর্তিভো। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল— ‘বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলে না, একে সেলাই করে।’ সেখানে দেশের জার্সি ব্যবসা ও পোশাক শিল্পে বিশ্বকাপের প্রভাবের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
সাধারণ সময়ে এসব দোকানে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের রেপ্লিকা জার্সি বিক্রি হলেও বিশ্বকাপ এলেই বিক্রির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে বিভিন্ন জাতীয় দলের জার্সি। কারণ, বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অংশ না নিলেও দেশের ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা জার্সির বাজারকে চাঙা করে তোলে।
রাজধানীর সমবায় টুইন টাওয়ার মার্কেটের এক বিক্রেতা জানান, সাধারণ সময়ে তারা প্রতিদিন গড়ে ১৫০টি জার্সি বিক্রি করেন। তবে বিশ্বকাপ শুরুর আগে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় পাঁচ হাজারে পৌঁছায়। বর্তমানে জনপ্রিয় দলগুলো একাধিক ম্যাচ খেলে ফেলায় বিক্রি কিছুটা কমে দৈনিক প্রায় তিন হাজারে নেমে এসেছে।
প্রায় ৮০০ দোকানের এই মার্কেটের অধিকাংশই বিশ্বকাপ চলাকালে ফুটবল জার্সি বিক্রি করে। পাশাপাশি আশপাশের আরও কয়েকটি মার্কেট, যেগুলো সাধারণত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য পরিচিত, তারাও এই সময়ে জার্সির ব্যবসায় যুক্ত হয়।
বিশ্বকাপ চলাকালে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে, বড় পর্দায় খেলা দেখার সময় হাজারো সমর্থক প্রিয় দলের জার্সি পরে অংশ নেন। ঐতিহাসিকভাবে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকই সবচেয়ে বেশি।
এবার আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পাশাপাশি ইরান ও মরক্কোর জার্সির চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এছাড়া জার্মানি, স্পেন ও ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় দলগুলোর জার্সিও ভালো বিক্রি হচ্ছে।
গত বিশ্বকাপে মরক্কোর সেমিফাইনালে ওঠা দেশটির জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের পর বাংলাদেশের অনেক সমর্থক সংহতি প্রকাশের অংশ হিসেবে ইরানের জার্সিও কিনছেন।
এক বিক্রেতা জানান, আগে মূলত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সির চাহিদাই ছিল বেশি। এখন আরও অনেক দল যুক্ত হয়েছে। এমনকি অনেকেই বাংলাদেশের জার্সিরও খোঁজ করেন, যদিও দলটি বিশ্বকাপে অংশ নেয় না।
তবে এসব বাজারে বিক্রি হওয়া জার্সির মান শপিং মলে বিক্রি হওয়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত অফিসিয়াল জার্সির মতো নয়। অধিকাংশ সমর্থকের পক্ষে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জার্সি কেনা সম্ভব না হওয়ায় স্থানীয়ভাবে তৈরি বা চীন থেকে আমদানি করা সাশ্রয়ী মূল্যের রেপ্লিকা জার্সিই তাদের ভরসা। এসব জার্সির দাম সাধারণত ৩০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে।
বাংলাদেশ শুধু রেপ্লিকা জার্সির বাজারই নয়, বিশ্ব ক্রীড়া পোশাক শিল্পেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া কয়েকটি দলের অফিসিয়াল জার্সিও উৎপাদিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে তৈরি জার্সি পরা দলগুলোর মধ্যে রয়েছে কেপ ভার্দে। দেশটির অফিসিয়াল জার্সি ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় উৎপাদিত হয়ে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মাধ্যমে বাজারজাত করা হচ্ছে।
দেশের শীর্ষ পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিশ্বকাপের বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর অর্ডার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। খেলোয়াড়দের ব্যবহারের জার্সির পাশাপাশি সমর্থকদের জন্য তৈরি সংস্করণও বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশ ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের তুলার নিট টি-শার্ট, ১ দশমিক ৩০৪ বিলিয়ন ডলারের সিনথেটিক ফাইবারের টি-শার্ট এবং ১৫৫ মিলিয়ন ডলারের নন-কটন নিট পোশাক রপ্তানি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এপ্রিল ও মে মাসের রপ্তানি হিসাব যুক্ত হলে এই পরিমাণ আরও বাড়বে, কারণ বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট অনেক চালান এ সময়েই বিদেশে পাঠানো হয়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে নিটওয়্যার পণ্যের রপ্তানি ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেড়ে ২১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে গুণগত মান ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের কারণে বাংলাদেশের স্পোর্টসওয়্যারের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে, আর বিশ্বকাপ সেই চাহিদাকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
রিপোর্টার্স২৪/বাবি