সায়েম উদ্দিন:
একটি সমাজ বা রাষ্ট্র তখনই সত্যিকারের বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন মানুষ অন্যের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। বাংলাদেশে বর্তমানে শিশুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এমন এক স্তরে পৌঁছেছে যেখানে একটি শিশুর মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিও সামষ্টিক বিবেককে সহজে নাড়া দিতে পারছে না। দেশের প্রত্যেকটি পরিবার-বিশেষ করে যাদের ঘরে কন্যাসন্তান আছে-চরম আতঙ্কে দিন পার করছে। বর্তমান সামাজিক ও অনলাইন পরিবেশ এতটাই অনিরাপদ ও অসুস্থ হয়ে উঠেছে যে, সামর্থ্যবান অভিভাবকরা সন্তানদের একটি নিরাপদ পরিবেশ দেওয়ার জন্য দেশ ছাড়ার কথা ভাবছেন, আর যাদের সেই সামর্থ্য নেই তারা প্রতিনিয়ত এক অজানা ভয়ে নিজেদের সন্তানদের চলাফেরা সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ একটি স্বাধীন ও সভ্য রাষ্ট্রে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও স্বস্তির পৃথিবী নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। বড়দের ব্যক্তিস্বার্থ, লোভ, পারিবারিক অস্থিরতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে কোমলমতি শিশুরা আজ সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে। আর কত শিশুর প্রাণহানি ঘটলে এই দেশ শিশুদের জন্য নিরাপদ হবে, সেই প্রশ্ন আজ প্রতিটি নাগরিকের বিবেককে তাড়িত করছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান দেশের শিশু নিরাপত্তার এই ভয়াবহ চিত্রটি পরিষ্কার করে দেয়। তাদের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত গত ১৬ মাসে দেশে অন্তত ৫২২ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, যা গড়ে প্রতি মাসে ৩২ জনেরও বেশি। একই সময়ে ধর্ষণসহ চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১ হাজার ২২৩ শিশু, যার গড় হার মাসে ৭৬ জনের বেশি। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, সমাজে শিশুদের সুরক্ষার দেওয়াল কতটা ভেঙে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে চেনা পরিবেশেও কাউকেই বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অভিভাবকেরা জানাচ্ছেন, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ পশুর স্তরে নেমে গেছে, যেখানে বাবা-মা ছাড়া সন্তানের আর কোনো নিরাপদ আশ্রয় অবশিষ্ট নেই।
এই চরম নিরাপত্তাহীনতার ভেতরেই একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে চলেছে। সম্প্রতি ঢাকার পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে শৌচাগারে নিয়ে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয়। এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল রানা (৩০) ও তার স্ত্রী স্বপ্ন আক্তারকে (২৬) অভিযুক্ত করা হয়েছে। গত ১৯ মে সকালে পল্লবী সেকশন-১১ এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রায় একই ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে। সেখানকার জঙ্গল থেকে উদ্ধার হওয়া এক শিশুকে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হত্যার চেষ্টা চালান প্রতিবেশী বাবু শেখ। মৃত ভেবে শিশুটিকে তিনি পাহাড়ের খাদে ফেলে যান। গত ১ মার্চ দুর্গম পাহাড় থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার হওয়া ওই শিশুটি পরদিন ২ মার্চ দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। এর বাইরে, বিগত এক বছরে বিভিন্ন মাদ্রাসায় ছেলে শিশুদের ওপরও বলাৎকার, হত্যা ও আত্মহত্যার প্ররোচনার মতো আশঙ্কাজনক ঘটনা ঘটেছে।
সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হলো, সমাজ ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থানে পরিণত হচ্ছে যেখানে একটি শিশুকেও যৌন আকাঙ্ক্ষা থেকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না এবং তার শরীরকেও ভোগ্যপণ্য করে তোলা হচ্ছে। শুধু বাইরের পরিবেশই নয়, পারিবারিক কলহ ও স্বজনদের হাতে শিশু হত্যার ঘটনাগুলো এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীর বাড্ডায় তিন বছরের নিষ্পাপ শিশু হাবিব প্রাণ হারিয়েছে খোদ নিজের বাবার চরম নিষ্ঠুরতায়। গত ২৭ এপ্রিল স্ত্রী শিল্পী খাতুনের কাছে মাদক কেনার টাকা না পেয়ে তার সামনেই সন্তানকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন শাহিন মিয়া। একই দিনে গাজীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহে গলা কেটে ও পানিতে ফেলে আরও পাঁচ শিশুকে হত্যা করা হয়। এছাড়া গত ৯ মে গাজীপুরের কাপাসিয়াতে সন্দেহপ্রবণ ও মাদকাসক্ত ফোরকান আলী তার স্ত্রী শারমিন খানম ও শ্যালক রসুলসহ নিজের তিন সন্তান ফারিয়া (২), মারিয়া (৮) ও মিমকে (১৬) গলা কেটে হত্যা করে পালিয়ে যান। বগুড়ায় গত ৮ মে জন্ম নেওয়া এক নবজাতককে গলা কেটে পুকুরে ফেলে হত্যার অভিযোগে পরদিন মা নিপা আক্তার ও সৎবাবা দুলাল মিয়াকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকাসক্তির এই অবাধ বিস্তার ও বড়দের অনৈতিক দ্বন্দ্ব শিশুদের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত ১৮ মার্চ ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে মাত্র চার বছর বয়সী মরিয়ম আক্তারকে তার গলার রুপার চেইন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে ইয়াছিন মিয়া (১৬) ও আকাশ (১৫) নামের দুই কিশোর। পরে লাশটি পাশের একটি মাটির চুলার ভেতর লুকিয়ে রাখা হয়। মরিয়ম ছিল মিজানুর রহমান ও রিমা আক্তার দম্পতির একমাত্র সন্তান। এছাড়া, ঢাকার সাভারে মাদকের টাকার জন্য ১২ বছরের এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়, যে ঘটনায় রাব্বানী মোল্লা নামের এক যুবক গ্রেফতার হয়েছেন। গত ২৪ এপ্রিল ফরিদপুরের বাখুন্ডা আশ্রয়ণ প্রকল্পে সাত বছরের শিশু আইরিন আক্তার কবিতাকে ধর্ষণের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে হত্যা করেন ইসরাফিল মৃধা নামের এক মাদকাসক্ত যুবক। গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামুতে মাদকের টাকার দাবিতে তিন বছরের শিশু ফাতেমাকে কুপিয়ে হত্যা করে তার আপন মামা নুরুল হাকিম। বড়দের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও লোভের বলি হওয়া আরেকটি উদাহরণ হলো নয় বছরের শিশু আন্দালিব সাদমান ওরফে রাফি। গত ৯ মে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় অনলাইন জুয়ার টাকা নিয়ে বাবার সঙ্গে বিরোধের জেরে এই শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করে মরদেহ সেপটিক ট্যাংকে লুকিয়ে রাখা হয়। এই ঘটনায় প্রতিবেশী নূর মুহাম্মদ খোকনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই দিনে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদ এলাকায় প্রকাশ্য গুলিবর্ষণে হাসান রাজু (৩২) নামে এক যুবক নিহত হন এবং ১১ বছরের শিশু রেশমি আক্তার চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
মনোরোগ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সামাজিক অনুশাসন ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, সাইবার আসক্তি, অনৈতিক সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়া এবং দ্রুত বিত্তশালী হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা শিশুদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। সাইকোথেরাপিস্ট নুসরাত সাবরিন চৌধুরী বলেন, শিশুদের প্রতি যৌন আকাঙ্খা বা সহিংসতা কেবল সামাজিক অপরাধ নয়, এটি শিশুর নিরাপত্তা বোধ ও ভবিষ্যৎ মানসিক বিকাশকে ধ্বংসকারী একটি গভীর মানসিক সংকট। পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন, অভিভাবকের দীর্ঘসময় অনুপস্থিতি, পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানের অভাব এবং ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্টের সহজলভ্যতা এই ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ভুক্তভোগী শিশুরা সামাজিক চাপ ও লোকলজ্জার ভয়ে অনেক সময় নীরব থাকে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি ট্রমার দিকে ঠেলে দেয়। এই সংকট উত্তরণে দ্রুত বিচার, কঠোর শাস্তি এবং ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা রক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বড়দের দ্বন্দ্বে বা পরিবারের সদস্যদের মাদকাসক্তির কারণে শিশুরা প্রতিশোধের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। স্বজনদের হাতে নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাগুলোর দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার কারণেই অপরাধের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। তিনি শিশুদের নিরাপত্তায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, কেবল আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, আইনের সঠিক প্রয়োগ জরুরি। তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, পরকীয়া, নৈতিকতার অবক্ষয় এবং পারিবারিক ছোটখাটো বিরোধে তৃতীয় পক্ষের নেতিবাচক ইন্ধন পারিবারিক সহিংসতাকে আরও উসকে দিচ্ছে।
আইনৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, অপরাধীরা সাধারণত দুর্বল ও সহজ লক্ষ্য হিসেবে শিশুদের টার্গেট করে থাকে। আগে মুক্তিপণ বা প্রতিশোধের জন্য অপহরণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটলেও, বর্তমানে পারিবারিক অস্থিরতার কারণে মা-বাবার হাতে সন্তান খুনের ঘটনা বাড়ছে। নিহত শিশু রামিসার পিতা আবদুল হান্নান মোল্লা বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও দৃষ্টান্ত তৈরিতে ব্যর্থতা নিয়ে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। তবে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ.এইচ.এম শাহাদাত হোসেন বলেন, শিশুদের ওপর নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনা পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে এবং যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, সামাজিক সচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে বিট পুলিশিং ও উঠান বৈঠক পরিচালনা করা হচ্ছে। সমাজে পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফেরাতে পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।
একটি শিশুকে ঘিরে যেখানে গভীর শোক ও মানবিক সহানুভূতি থাকার কথা, সেখানে বর্তমান অনলাইন সংস্কৃতিতে এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে অশ্লীলতা, কুরুচিপূর্ণ উপহাস ও বিকৃত গল্প তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা শিশুর জীবনকে কেবলই ‘কনটেন্ট’ হিসেবে ব্যবহারের শামিল। অনলাইন জগতে ঘৃণা ও নিষ্ঠুরতাকে স্বাভাবিক করার ফলেই সামাজিকভাবে এই মানসিক বিকৃতি দেখা দিয়েছে, যেখানে মানুষ ট্র্যাজেডির মধ্যেও বাণিজ্যিক সুবিধা ও সস্তা বিনোদন খোঁজে। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক উন্নয়নের দিকে সবাইকে নজর দিতে হবে এবং অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী