ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: ইউরোপিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর চ্যাম্পিয়ন্স লিগে প্যারিস সেন্ট জার্মেইন (পিএসজি)-এর ঐতিহাসিক শিরোপা জয়ের উল্লাস শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় সহিংসতা ও সংঘর্ষে। দলের বিজয় উদযাপন করতে হাজার হাজার সমর্থক রাস্তায় নেমে এলে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অভিযান চালিয়ে শুধু প্যারিস থেকেই ২৮৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে মোট ৪১৬ জনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী প্যারিসেই আটক হয়েছেন ২৮৩ জন। তবে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কতজনকে পরবর্তী তদন্তের জন্য হেফাজতে রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
গত বছর পিএসজির জয় উদযাপনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার অভিজ্ঞতা থাকায় এবার আগেভাগেই ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। সারা দেশে প্রায় ২২ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়, যার মধ্যে শুধু প্যারিসেই দায়িত্ব পালন করেন প্রায় ৮ হাজার পুলিশ সদস্য।
নিরাপত্তার স্বার্থে রাজধানীর বেশ কয়েকটি ট্রাম সার্ভিস বন্ধ রাখা হয়। পাশাপাশি একাধিক মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং কিছু এলাকায় বাস চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Laurent Nuñez জানিয়েছেন, সংঘর্ষের ঘটনায় সাতজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তিনি এ ধরনের সহিংসতাকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন। এছাড়া সংঘর্ষে ছয়টি যানবাহন ও দুটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, একদল সমর্থক প্যারিসের ব্যস্ত রিং রোড ‘পেরিফেরিক’-এ প্রবেশ করে ফ্লেয়ার জ্বালিয়ে সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এতে কিছু সময়ের জন্য ওই এলাকায় চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
হাঙ্গেরির রাজধানী Budapest-এ অনুষ্ঠিত ফাইনালে নাটকীয় জয়ের পর প্যারিসের বিখ্যাত Champs-Élysées এলাকায় প্রায় ২০ হাজার সমর্থক জড়ো হন। গত বছরের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে অনেক দোকানপাট ম্যাচের আগেই নিজেদের জানালায় সুরক্ষা বোর্ড স্থাপন করে। শনিবার অভিযান চালিয়ে ২৪টি ফ্লেয়ার এবং প্রায় ১০০টি আতশবাজি জব্দ করেছে পুলিশ। এছাড়া শঁজেলিজে এলাকার কাছে একটি বাস শেল্টার ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
অন্যদিকে, Paris Saint-Germain-এর হোম ভেন্যু Parc des Princes স্টেডিয়ামের ভেতরে হাজারো দর্শক বড় পর্দায় ফাইনাল উপভোগ করলেও বাইরে জড়ো হওয়া চার থেকে পাঁচ হাজার সমর্থকের একটি অংশ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
পুলিশের এক মুখপাত্র জানান, প্রায় ১৫০ জন সমর্থক স্টেডিয়ামের একটি গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে তাদের বাধা দেওয়া হয়। এ সময় কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি ভাড়ার সাইকেল ব্যবহার করে অস্থায়ী ব্যারিকেড তৈরির চেষ্টা করলে পুলিশ তা সরিয়ে দেয়।
ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্টেডিয়ামের আশপাশে সমর্থকদের একটি অংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজি নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এ ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফ্রান্সের চরম ডানপন্থি নেত্রী Marine Le Pen। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, শুধু ফ্রান্সেই বোধহয় এমনটা ঘটে, যেখানে একটি ফুটবল ক্লাবের জয় দাঙ্গার সূচনা করে। শুধু ফ্রান্সেই মানুষ মনে করে, সহিংসতার মুখোমুখি না হতে চাইলে জয়ের রাতে ঘরে বসে থাকতে হবে।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ দাবি করেছেন, সম্ভাব্য সহিংসতা ঠেকাতে কর্তৃপক্ষ ‘অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুসংগঠিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ গ্রহণ করেছিল। পুলিশের এক মুখপাত্রও বলেছেন, “আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল সব সমর্থকের জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ এবং আনন্দমুখর উদযাপন নিশ্চিত করা।”
এদিকে বিজয় উদযাপনকে ঘিরে রোববার বিকেলে প্যারিসের বিখ্যাত Eiffel Tower-এর সামনে অবস্থিত Champ de Mars প্রাঙ্গণে পিএসজি খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণে একটি বিশেষ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে প্রায় এক লাখ মানুষের সমাগম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এরপর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট Emmanuel Macron প্যারিসের Élysée Palace-এ চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী পিএসজি দলকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা দেবেন।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম