| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা বাংলাও পড়তে পারে না

reporter
  • আপডেট টাইম: Jul ০৫, ২০২৬ ইং | ১৯:২৫:২০:অপরাহ্ন  |  ১১২০৬১ বার পঠিত
সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা বাংলাও পড়তে পারে না

স্টাফ রিপোর্টার: দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের মৌলিক সাক্ষরতা ও গণনাদক্ষতায় উদ্বেগজনক ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে সরকারের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পঞ্চম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী বাংলা বর্ণমালার সব অক্ষর সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না। তারা ইংরেজি বইয়ের নির্দেশনা কিংবা পরিচিত অনেক ইংরেজি শব্দও পড়তে অক্ষম। অন্যদিকে দ্বিতীয় শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী এখনো এমন সাধারণ বিয়োগের অঙ্ক করতে পারে না, যেখানে বিয়োজ্যের এককের অঙ্ক বিয়োগকারীর এককের অঙ্কের চেয়ে ছোট।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ইউনিট (Compulsory Primary Education Implementation Monitoring Unit) এ প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে। ‘ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মৌলিক সাক্ষরতা ও গণনাদক্ষতা’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনটি এখনও প্রকাশিত হয়নি।

গত জুন মাসে ইউনিটটি ঢাকা মহানগর, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মাগুরা, শেরপুর, খুলনা ও দিনাজপুর জেলার ২ হাজার ২৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর ও ঢাকা জেলায় ৯৫০টি, নারায়ণগঞ্জে ৫৪৭টি, মুন্সীগঞ্জে ৬১৩টি, মাগুরায় ৫১টি, শেরপুরে ২৫টি, খুলনায় ৩৮টি এবং দিনাজপুরে ৪৩টি বিদ্যালয় ছিল। সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই এ পরিদর্শনের আওতায় আনা হয়।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকা মহানগর, ঢাকা জেলা ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থা নারায়ণগঞ্জে। সেখানে ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলায়, ৪১ শতাংশ গণিতে এবং ৪৩ শতাংশ ইংরেজিতে অদক্ষ। ঢাকা মহানগরে এ হার যথাক্রমে ২৯, ৩৭ ও ৩৮ শতাংশ। আর ঢাকা জেলায় বাংলায় ৩৩ শতাংশ, গণিতে ৩৮ শতাংশ এবং ইংরেজিতে ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী অদক্ষ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষাদান পদ্ধতিতে মোট ১৯টি ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বাংলা ভাষার বর্ণগুলো সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী অক্ষর চিনতে পারলেও অক্ষর ও শব্দের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে সমস্যায় পড়ে।

ইংরেজি বিষয়ে দেখা গেছে, পঞ্চম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ের নির্দেশনা পড়তে পারে না। পরিচিত শব্দ পড়তেও তাদের সমস্যা হয়। একাধিক সিলেবলযুক্ত ইংরেজি শব্দ পড়তে পারে না অধিকাংশ শিক্ষার্থী এবং সাবলীলভাবে ইংরেজি পড়তে সক্ষম শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম।

গণিতে দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ শ্রেণির অধিকাংশ শিক্ষার্থীর দক্ষতা স্থানীয় মানদণ্ড অনুযায়ী সন্তোষজনক নয়। বিশেষ করে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এমন বিয়োগের অঙ্ক করতে পারে না, যেখানে ধার নেওয়ার প্রয়োজন হয়। প্রতিবেদনে এর জন্য বিদ্যালয়গুলোতে প্রচলিত ভুল পদ্ধতিতে বিয়োগ শেখানোকে দায়ী করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ছেলেশিক্ষার্থীরা মেয়েদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। ঢাকার বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার খুবই কম। কিছু বিদ্যালয়ে একটি শ্রেণিতে মাত্র একজন বা দুজন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান হয়—এমন সব বিদ্যালয়ের শিক্ষক কোচিং কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। অনিয়মিত শিক্ষার্থীরা পাঠে পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষকদের মধ্যে আকস্মিক ছুটি নেওয়ার প্রবণতা বেশি এবং অনেক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাও নেই।

জ্যেষ্ঠ শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মঞ্জুর আহমেদ বলেন, এ ধরনের ফলাফল নতুন নয়। অতীতের বিভিন্ন গবেষণাতেও একই চিত্র উঠে এসেছে। তিনি বলেন, দক্ষ শিক্ষকের অভাব, পর্যাপ্ত তদারকির ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রাথমিক স্তরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বড় ব্যবধানের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হলেও এখনো কার্যকর উন্নতি হয়নি।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সুপারিশ প্রণয়নকারী আগের অন্তর্বর্তী সরকারের দুটি পরামর্শ কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অধ্যাপক মঞ্জুর আহমেদ প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বিভিন্ন গবেষণাতেও একই ধরনের উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফ পরিচালিত মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৫০ দশমিক ১ শতাংশ মৌলিক পাঠদক্ষতা অর্জন করতে পেরেছে। ২০১৯ সালে এ হার ছিল ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ। একই বয়সী শিশুদের মধ্যে মৌলিক গণনাদক্ষতা অর্জন করেছে ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে ছিল ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ। এ সময় প্রাথমিক শিক্ষায় নেট ইনটেক রেট ৬১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডিকেটর অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে লার্নিং পোভার্টি ছিল ৫১ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশের অর্ধেকের বেশি শিশু ১০ বছর বয়সেও একটি সহজ পাঠ্য পড়ে বুঝতে সক্ষম নয়।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহিনা ফেরদৌসী বলেন, প্রতিবেদনে যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে, তা আগের পরিস্থিতির প্রতিফলন। বর্তমানে শিক্ষাদান ও শেখার মান উন্নয়নে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষককে উদ্বুদ্ধ করা, তদারকি জোরদার করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠকসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। তার আশা, আগামী অক্টোবরের মধ্যে মৌলিক সাক্ষরতা ও গণনাদক্ষতায় সন্তোষজনক অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন বিষয়ে গড় দক্ষতার বিচারে ঢাকা মহানগরে সবচেয়ে পিছিয়ে কোতোয়ালি (৫৫ শতাংশ) ও গুলশান (৫৬ শতাংশ)। ঢাকা জেলায় সবচেয়ে কম দক্ষতা দোহারে (৫৯ শতাংশ), এরপর কেরানীগঞ্জে (৬০ শতাংশ)। আর নারায়ণগঞ্জে সবচেয়ে কম দক্ষতা আড়াইহাজারে (৫৪ শতাংশ), এরপর সোনারগাঁয়ে (৫৬ শতাংশ)।

পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রতিবেদনে ২৬টি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলা ও ইংরেজিতে সম্পূরক পাঠ্যসামগ্রী ব্যবহার, প্রথম পিরিয়ডে গণিত ও ইংরেজি ক্লাস নেওয়া, প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে দুই বা তিনজন শিক্ষককে গণিত অলিম্পিয়াড বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া, শিক্ষকদের যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান নিশ্চিত করা, বিদ্যালয়ে কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগ, নিয়মিতভাবে বাড়ির কাজ মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীসংখ্যা কম এমন বিদ্যালয় একীভূত করা, শিক্ষকসংকট রয়েছে এমন বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে কার্যকর ভূমিকা পালন করা।

এদিকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর পরিচালিত ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্টস-২০২৩-এর ফলাফলেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। দেশের ৯৯৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ৬০ হাজার অষ্টম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত এ মূল্যায়নে দেখা যায়, প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা ও ইংরেজি পড়ানো হলেও বহু শিক্ষার্থী এ দুই ভাষায় দুর্বল থেকে যাচ্ছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাতেও অনেকে বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে অকৃতকার্য হচ্ছে। সূত্র: নিউ এজ

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪