| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

টিসিবির লাইন ধরে এসেছিল মৃত্যু: ক্ষুধা কেড়ে নিল তিন প্রান

reporter
  • আপডেট টাইম: Jul ২৯, ২০২৬ ইং | ২১:৫৫:০৬:অপরাহ্ন  |  ১৬৩০ বার পঠিত
টিসিবির লাইন ধরে এসেছিল মৃত্যু: ক্ষুধা কেড়ে নিল তিন প্রান

স্টাফ রিপোর্টার: পেটের দায়ে স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে টিসিবির ট্রাকের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন কয়েকজন দিনমজুর ও কর্মজীবী। স্বল্প আয়ের কারণে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে কম মূল্যে পণ্য কিনতে অপেক্ষা করছিলেন তারা। স্বজনদের অন্ন জোগাতে সেই অপেক্ষার প্রহর আর শেষ হয়নি। শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষাই তাদের জীবনের শেষ অপেক্ষায় পরিণত হয়।  হঠাৎ পাশের একটি কলেজের পুরোনো ও জরাজীর্ণ দেয়াল ধসে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হলে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় তিনজনে। তারা কম টাকায় যেনো জীবন কিনতে এসেছিলেন, কিন্তু টিসিবির লাইন ধরে এসেছিলো মৃত্যু। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। 

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দুপুর দেড়টার দিকে মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সীমানাপ্রাচীর ধসে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন নাছিমা বেগম, বিউটি বেগম ও মো. ফিরোজ। এর মধ্যে নাছিমা বেগম মিরপুর–২ নম্বর জনতা হাউজিং এলাকায় থাকতেন। নিহত বিউটি বেগমের বাসা মিরপুর–২ নম্বর লাভ রোডের পানির ট্যাংকির কাছে। আর ফিরোজের বাসা মিরপুর–১ নম্বর শাহআলীবাগে। তিনি পেশায় রিকশাচালক ছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল থেকেই টিসিবির পণ্য বিক্রির খবর পেয়ে নারী-পুরুষসহ শতাধিক মানুষ লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার একপর্যায়ে পুরোনো দেয়ালটি ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়। আহতদের স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়। জীবিকার আশায় অপেক্ষমাণ তিনজনের প্রাণ মুহূর্তেই ঝরে যায়।

এ ঘটনায় আহত সাতজন পঙ্গু হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রাজিয়া বেগম, মনোয়ার ও মোশারফ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। এক শিশু চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেছে। বাকিরা পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁদের অবস্থাও গুরুতর। কারও মাথা ফেটে গেছে, কারও পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চামড়ার সঙ্গে ঝুলে ছিল, আবার কারও শরীরের একাধিক স্থানের চামড়া উঠে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা জুবায়ের আহমেদ বলেন, বহুদিন ধরেই দেয়ালটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সময়মতো দেয়ালটি অপসারণ বা সংস্কার করা হলে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো।

তিনি আরও বলেন, এ দেয়ালের পাশে এলাকার অনেক শিশু খেলাধুলা করত। যদি খেলাধুলার সময় এমন ঘটনা ঘটত, তাহলে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। দেয়ালটি ২০১৪ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল। সে সময় নির্মাণকাজে বালুর তুলনায় সিমেন্টের পরিমাণ কম ছিল। এ নিয়ে আমরা কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

প্রত্যক্ষদর্শী ডাব বিক্রেতা শাকিব বলেন, গতকাল সকাল ১১টার পর টিসিবির একটি গাড়ি এসে পণ্য বিক্রি শুরু করে। এ সময় আশপাশের অনেক বাসিন্দা পণ্য কিনতে লাইনে দাঁড়ান। সেখানে অনেক মানুষ ছিল। আমার দোকানেও অনেক ক্রেতা ছিল। হঠাৎ দেখি দেয়াল ধসে পড়ল। চারদিকে শুধু চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ।

তিনি আরও বলেন, সঙ্গে সঙ্গে আমরা দৌড়ে গিয়ে দেখি কয়েকজনের মাথা ফেটে গেছে। এর মধ্যে দুজনের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তারা দেয়ালের নিচে চাপা পড়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে রাতে শুনলাম তিনজন মারা গেছেন। আমার মনে হয়েছে, দুই নারী ও একজন পুরুষের অবস্থা সবচেয়ে গুরুতর ছিল।

প্রত্যক্ষদর্শী পান বিক্রেতা জাহিদ বলেন, কিছুদিন আগের ভূমিকম্পে কলেজের এই সীমানাপ্রাচীর বেঁকে নড়বড়ে হয়ে পড়ে। তখন কলেজ কর্তৃপক্ষ দেয়ালটি পরিদর্শনও করে। সংস্কারের কথা থাকলেও তা করা হয়নি। কলেজ কর্তৃপক্ষ এ দায় এড়াতে পারে না।

মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বজলুল বাসিত আঞ্জু বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। ঘটনাটি জানতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে কলেজের অধ্যক্ষকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। ভেঙে যাওয়া এই সীমানাপ্রাচীর ২০১৪ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল। সে সময় কলেজের সভাপতি ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য আসলামুল হক। ওই সময় নির্মাণকাজে ত্রুটি ছিল। বিষয়টি নিয়ে অভিযোগও করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর ফলেই এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে।

তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলী, হাউজ বিল্ডিংয়ের প্রকৌশলী ও কলেজের শিক্ষকদের নিয়ে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে কারও গাফিলতি পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিহত নাছিমার স্বজন তারেক বলেন, নাছিমা আমার পাশের বাসায় থাকতেন। তিনি বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। সামান্য আয় দিয়েই কম দামে জিনিসপত্র কিনে সংসার চালাতেন। সেই কম দামে পণ্য কিনতে গিয়েই তার জীবন চলে গেল। এখন তাঁর পরিবারের সদস্যদের কে দেখবে? ক্ষুধার তাড়নায় টিসিবির পণ্য কিনতে গিয়ে তিনি লাশ হয়ে ফিরলেন।

রুবেল জানান, রাজিয়া বেগম তাঁর শাশুড়ি। তিনি মিরপুর–১০ নম্বর সেনপাড়া এলাকায় থাকেন। টিসিবির পণ্য নিতে তিনিও লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন কলেজের সীমানাপ্রাচীর ধসে তাঁদের ওপর পড়ে। এতে তাঁর শাশুড়িও দেয়ালচাপা পড়েন। খবর পেয়ে তিনি এসে শাশুড়িকে অ্যাম্বুলেন্সে দেখতে পান এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

তিনি আরও বলেন, ইট পড়ে তাঁর শাশুড়ির মাথা ফেটে গেছে। রক্তে পুরো শরীর ও শাড়ি ভিজে গেছে। বাম পায়ের তিন জায়গা ভেঙে গেছে।

এদিকে নিহত হন ফিরোজ নামে আরেক ব্যক্তি। তিনি পেশায় রিকশাচালক ছিলেন। নিহত ফিরোজের স্ত্রী সাহিদা আক্তার আহাজারি করতে করতে বলেন, আমার স্বামী রিকশা চালাতেন। এই আয় দিয়েই কোনোভাবে সংসার চলত। আমাদের পাঁচ ও সাত বছরের দুটি মেয়ে সন্তান আছে।

তিনি আরও বলেন, রিকশা চালাতে গিয়ে সামনে টিসিবির গাড়ি দেখলে সেখানে কম দামে চাল-ডাল কিনে আনতেন। গতকাল মিরপুর–২ এলাকায় টিসিবির গাড়ি দেখে রিকশা দাঁড় করিয়ে পণ্য কিনতে লাইনে দাঁড়ান। এরপরই এ দুর্ঘটনা ঘটে। আমি আমার দুই সন্তানকে নিয়ে কোথায় যাব? কে তাদের দেখবে? বলে তিনি আহাজারি করছিলেন।

দেয়াল ধসে মৃত্যুর ঘটনায় মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় আমাদের থানায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। ময়নাতদন্ত শেষে নিহতদের পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১২ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

তিনি আরও বলেন, দেয়াল ধসের পরপরই আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার পর কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, দেয়ালটি দীর্ঘদিনের পুরোনো ছিল এবং তেমন মজবুতও ছিল না। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মিরপুরে দেয়ালচাপায় আহতদের দেখতে হাসপাতালে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিনি পঙ্গু হাসপাতালে যান। এ সময় তিনি আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সরকারের পক্ষ থেকে চিকিৎসায় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪