| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

দুই শতকের নীলকুঠি: নির্যাতনের স্মৃতি পেরিয়ে আজ জনসেবার ঠিকানা

reporter
  • আপডেট টাইম: Jul ৩১, ২০২৬ ইং | ১৭:৪৭:৪১:অপরাহ্ন  |  ৮২১ বার পঠিত
দুই শতকের নীলকুঠি: নির্যাতনের স্মৃতি পেরিয়ে আজ জনসেবার ঠিকানা

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে একটি ভবন। একসময় যেখানে ছিল নীলকরদের অত্যাচারের কেন্দ্র, কৃষকের কান্না ও শোষণের স্মৃতি আজ সেই ভবনেই চলছে সাধারণ মানুষের ভূমিসেবা কার্যক্রম। ইতিহাসের নির্মম অতীত পেরিয়ে জনসেবার নতুন পরিচয়ে দাঁড়িয়ে আছে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের সোনাকুণ্ডি গ্রামের ঐতিহাসিক নীলকুঠি।

বাংলার নীল বিদ্রোহ, কৃষকের সংগ্রাম এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের এক অন্ধকার অধ্যায়ের সাক্ষী এই স্থাপনাটি এখনো বহন করছে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি, ইতিহাসসংশ্লিষ্ট সূত্র ও এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৮০০ সালের দিকে চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত ছয় কক্ষবিশিষ্ট এই ভবনটি ছিল ব্রিটিশ নীলকরদের একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র। ভবনের চারপাশে থাকা সাতটি প্রাচীন দেবদারুগাছও যেন বহন করে চলেছে সেই সময়ের নীরব সাক্ষ্য।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউরোপে প্রাকৃতিক নীলের চাহিদা বাড়তে থাকায় ১৭৭৭ সালের পর বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠে নীলকুঠি। উর্বর জমি, পদ্মা নদীর নৌপথ ও কৃষি উপযোগী পরিবেশের কারণে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরও হয়ে ওঠে নীল উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র।

তবে নীল চাষ কৃষকদের জন্য উন্নতির পথ নয়, বরং শোষণের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, কৃষকদের অগ্রিম অর্থ বা ‘দাদন’ দিয়ে নীল চাষে বাধ্য করা হতো। পরে সেই অর্থই হয়ে উঠত শোষণের হাতিয়ার। নীল চাষে অস্বীকৃতি জানালে কৃষকদের ওপর চালানো হতো নানা ধরনের নির্যাতন। লাঠিয়াল বাহিনীর হামলা, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ছিল সে সময়ের ভয়াবহ বাস্তবতা।

এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকদের প্রতিবাদ থেকেই ১৮৫৯-৬০ সালের ঐতিহাসিক নীল বিদ্রোহের সূচনা হয়। এটি শুধু একটি কৃষক আন্দোলন ছিল না; বরং শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের আত্মমর্যাদা ও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।

সময় বদলেছে। যে ভবনে একসময় নীলকররা কৃষকদের ভাগ্য নির্ধারণ করতেন, সেই ভবনেই এখন চলছে হোগলবাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম। প্রতিদিন শত শত মানুষ এখানে জমির খতিয়ান, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন করসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা নিতে আসেন। যে স্থান একসময় কৃষকদের ভয়ের কারণ ছিল, আজ সেটিই হয়ে উঠেছে তাদের অধিকার নিশ্চিত করার সরকারি কেন্দ্র।

তবে কালের ভারে দুর্বল হয়ে পড়েছে প্রায় দুই শতকের পুরোনো এই স্থাপনাটি। ভবনের ছাদে ফাটল, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়া এবং বিভিন্ন অংশে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে হারিয়ে যেতে পারে ইতিহাসের এই মূল্যবান নিদর্শন।

জানা যায়, দৌলতপুর উপজেলার মহিষকুণ্ডি, পচামাদিয়া ও হোসেনাবাদ এলাকাতেও একসময় নীলকুঠি ছিল। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে সেগুলোর অধিকাংশই বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে কিছু স্থানে নতুন ভবনে ইউনিয়ন ভূমি অফিস পরিচালিত হলেও পুরোনো নীলকুঠির অস্তিত্ব আর নেই।

স্থানীয় বাসিন্দা তানভীর কবির বলেন, “দৌলতপুরের এই নীলকুঠি শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়, এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস, সংগ্রাম ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। যথাযথ সংরক্ষণ করা হলে এটি গবেষক ও পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হতে পারে।”

হোসেনাবাদ গ্রামের প্রবীণ আব্দুল মান্নান বলেন, “ছোটবেলায় বাবার মুখে ইংরেজদের অত্যাচারের অনেক গল্প শুনেছি। আগে এই জায়গার নাম শুনলেই মানুষ ভয় পেত। আজ সেই স্থানেই মানুষ নিজেদের জমির কাগজপত্রের কাজ করতে আসে। সময় অনেক কিছু বদলে দিয়েছে।”

দৌলতপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, “বর্তমানে ভবনটি ইউনিয়ন ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।”

ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; টিকে থাকে স্থাপনা, স্মৃতি ও মানুষের কথায়। দৌলতপুরের এই নীলকুঠি তেমনই এক জীবন্ত ইতিহাস, যা মনে করিয়ে দেয় ঔপনিবেশিক শোষণের অধ্যায়, কৃষকের সংগ্রাম এবং সময়ের পরিবর্তনের গল্প।

আজ এই ভবন শুধু একটি সরকারি দপ্তর নয়, এটি অতীত ও বর্তমানের এক অনন্য সেতুবন্ধন। যে দেয়াল একদিন নিপীড়নের প্রতীক ছিল, সেই দেয়ালই আজ মানুষের সেবা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আশ্রয়স্থল। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দৌলতপুরের এই ঐতিহাসিক নীলকুঠি সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।


রিপোর্টার্স২৪/ঝুম

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪