ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: চীনে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি আরও কঠোর হচ্ছে বলে দাবি করেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটির মতে, দেশটির বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে নাগরিকদের তথাকথিত ‘অবৈধ’ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের খবর কর্তৃপক্ষকে জানাতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ জন্য কোথাও কোথাও আর্থিক পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে চীনের অন্তত এক ডজন শহর ও অঞ্চলে এমন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
এসব পদক্ষেপের ফলে দেশটির খ্রিস্টান, মুসলিম ও তিব্বতি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
মানবাধিকার সংস্থাটির মতে, নতুন এসব ব্যবস্থা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৬ সালে যে ‘ধর্মের চীনাকরণ’ নীতি শুরু করেছিলেন, তারই আরও বিস্তৃত প্রয়োগ।
ওই নীতির আওতায় ধর্মীয় কর্মকাণ্ডকে চীনা সংস্কৃতি ও ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অভিযোগ। নতুন ব্যবস্থায় শুধু ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারীরাই নয়, তাদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা আইনজীবীরাও চাপের মুখে পড়ছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে জিয়ন চার্চের আইনজীবী রুথ ওয়াংয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ তার আইন ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর তিনি ২ সেপ্টেম্বর তাইওয়ানে চলে যান।
জিয়ন চার্চের প্রতিষ্ঠাতা যাজক এজরা জিনকে জুলাইয়ে উচ্চপর্যায়ের মার্কিন হস্তক্ষেপের পর মুক্তি দেওয়া হলেও আরও আটজন সদস্য আটক রয়েছেন বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে। তাদের ২০২৫ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
ইউনান প্রদেশের হংহে প্রিফেকচারে গত ফেব্রুয়ারিতে ‘অবৈধ’ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের ৩৫টি শ্রেণি চিহ্নিত করে তা জানানোর ব্যবস্থা করা হয়। এর মধ্যে ব্যক্তিগত বাড়ি বা অননুমোদিত স্থানে ধর্মীয় সভা বা অনুষ্ঠান আয়োজন, সরাসরি সম্প্রচার বা উইচ্যাট গ্রুপের মাধ্যমে ধর্মীয় প্রচার, জনসমক্ষে ধর্মীয় সামগ্রী বিতরণ এবং অনুমোদন ছাড়া ধর্মীয় শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের আয়োজনের মতো কর্মকাণ্ড রয়েছে।
কিংহাই প্রদেশের হাইডং শহরে এই নজরদারির আওতা আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। হোটেল ও ট্রাভেল এজেন্সির মতো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠান সম্পর্কে নজর রাখতে এবং কোনো ‘সন্দেহজনক’ পরিস্থিতি দেখলে কর্তৃপক্ষকে জানাতে বলা হয়েছে।
সিচুয়ান প্রদেশের চেংডুতে তথাকথিত ‘অবৈধ’ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের বিষয়ে যাচাইযোগ্য তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ৮০০ ইউয়ান পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, নতুন স্থানীয় বিধিগুলোর বেশির ভাগেই তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও জানিয়েছে, এসব ব্যবস্থার সঙ্গে চীনের নতুন প্রশাসনিক ও আইনি পরিবর্তনেরও সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি কার্যকর হওয়া জননিরাপত্তা প্রশাসন-সংক্রান্ত আইনে প্রথমবারের মতো ‘অবৈধ ধর্মীয় কর্মকাণ্ড’কে প্রশাসনিক আটকের কারণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য ৫ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত প্রশাসনিক আটক হতে পারে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
চীনা সরকার অবশ্য দেশটির নাগরিকদের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের সুযোগ রয়েছে বলে দাবি করে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, বাস্তবে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই বাড়ছে। সংস্থাটি বলছে, চীনে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত পাঁচটি ধর্মের কর্মকাণ্ডও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা, প্রকাশনা ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে।
চীনের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ২০১৬ সালে শি জিনপিং ধর্মকে ‘চীনাকরণ’-এর আহ্বান জানানোর পর থেকে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডকে রাষ্ট্রীয় নীতি ও কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ জোরদার হয়েছে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে ২০২৬ সালে নতুন করে চালু হওয়া তথ্যদাতা পুরস্কার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারির দায়িত্ব এবং ‘অবৈধ’ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের বিস্তৃত তালিকা নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ আরও বেড়েছে। সূত্র: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব