পাবনা প্রতিনিধি: ১০ থেকে ১২ জন। সবারই মুখ কাপড়ে ঢাকা। এসেই গুলি চালাল। এরপর যেতে যেতে বলতে লাগল, ‘আজ পুষ্পপাড়া স্বাধীন’। পাবনার জেলা সদরের আতাইকুলা থানার পুষ্পপাড়া হাটে গুলি করে দুজনকে হত্যার ঘটনার বর্ণনা এভাবেই দিলেন এক প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি ঘটনাস্থলের পাশের দোকানি।
গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার ওই ঘটনায় নিহত দুজন হলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ শ্রমিক লীগের পাবনা সদর উপজেলার আহ্বায়ক আবদুস সালাম (৫৬) ও তাঁর ভাগনে আতাইকুলা ইউনিয়ন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি রিপন হোসেন (৫০)।
দুজনই জেলা সদরের আতাইকুলা ইউনিয়নের ধর্মগ্রামের বাসিন্দা। আবদুস সালাম প্রায় ৩০ বছর ধরে পুষ্পপাড়া গরুর হাটের ইজারাদার ছিলেন। ভাগনে রিপন সব সময় মামার সঙ্গেই থাকতেন।
শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, পাবনা–ঢাকা মহাসড়ক থেকে নেমে বাঁ দিকে পুষ্পপাড়া গরুর হাট। আর সড়কের পাশে হাটের কার্যালয়। এই কার্যালয়ে ঘটেছিল গুলির ঘটনা। মেঝেতে রক্তের লাগ দাগ। সেখানে অনেক মানুষের ভিড়।
হাটের পাশেই নিহত আবদুস সালামের বাড়ি। সেখানেও নারী–পুরুষের ভিড়। বাড়ির সামনে মৃতদেহ বহনের খাটিয়া, ভেতরে চলছে মরদেহ গোসল দেওয়ার প্রস্তুতি। পাতিলে বড়ই পাতার গরম পানি নিয়ে মরদেহের জন্য অপেক্ষা করছেন কয়েকজন প্রবীণ। জানাজা শেষে আজ বাদ আসর তাঁদের স্থানীয় কবরস্থানে দাফনের কথা।
আবদুস সালামের বাড়িতে কথা হয় ফজলুল হক নামের গ্রামের এক প্রবীণের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বেটাডা (আবদুস সালাম) খুব ভালো ছিল। কয়েকবার হজ করছে। দান–খয়রাত করত। কী কারণে যে বেটাডাক মারল, বুঝবের পারতেছি না।’ একই কথা আবদুস সালামের আরেক প্রতিবেশীর। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘এই গরুর হাটের জন্যিই মনে হয় এত কিছু। তয় আমরা কিছুই বুঝবের পারতেছিনে।’
কথা হয় নিহত আবদুস সালামের বড় ভাই আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁর ভাই আবদুস সালাম প্রায় ৩০ বছর পুষ্পপাড়া হাটের ইজারাদার ছিলেন। তিনি পবিত্র কোরআনে হাফেজ। কয়েকবার হজ করেছেন। হাটের আয়ের অধিকাংশ টাকা মসজিদ ও মাদ্রাসায় দান করতেন। এটা অনেকেরই সহ্য হতো না।
তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘জানি না কী কারণে আমার ভাই ও ভাগনেকে হত্যা করা হয়েছে। তবে হাটের দখল নিতে হত্যাকাণ্ড হতে পারে বলে ধারণা করছি। খোঁজখবর নিচ্ছি। কারা ঘটনায় জড়িত নিশ্চিত হলে মামলা করব।’
জানি না কী কারণে আমার ভাই ও ভাগনেকে হত্যা করা হয়েছে। তবে হাটের দখল নিতে হত্যাকাণ্ড হতে পারে বলে ধারণা করছি। খোঁজখবর নিচ্ছি। কারা ঘটনায় জড়িত নিশ্চিত হলে মামলা করব।
ঘটনার দিন সন্ধ্যায় দুজনই হাটের কার্যালয়ে ছিলেন। সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে একদল দুর্বৃত্ত এসে তাঁদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয় লোকজন দুজনকে উদ্ধার করে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
এই জোড়া খুনের ঘটনা তদন্তে পুলিশ দুটি বিষয় সামনে রেখে এগোচ্ছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আতাইকুলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের এ ঘটনার সঙ্গে হাটের ইজারা ও পূর্বশত্রুতা থাকতে পারে। আমরা দুটি বিষয় গুরুত্ব দিয়েই ঘটনার তদন্ত করছি। তবে ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি।’
ঘটনার পর ওই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ বলেন, ‘নিহত আবদুস সালামের ভাই আবুল কালাম চরমপন্থী নেতা ছিলেন। হাটের ইজারা অথবা চরমপন্থীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি।’
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব