রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: অনুমোদন জটিলতা কাটিয়ে চলতি পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌপথে জাহাজ চলাচল শুরুর দ্বিতীয় দিনেই বেড়েছে পর্যটকের সংখ্যা। প্রথম দিন একটি জাহাজ চলাচল করলেও শুক্রবার (৬ নভেম্বর) যুক্ত হয়েছে আরও দুটি জাহাজ। সব মিলিয়ে তিনটি জাহাজে করে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন ১ হাজার ৫৫৪ জন পর্যটক।
শুক্রবার সকালে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে চলতি মৌসুমে প্রথমবারের মতো সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যায় এমভি কর্ণফুলী ও এমভি টেকনাফ। এর আগে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ৮৩৬ জন পর্যটক নিয়ে যাত্রা করা এমভি বারো আউলিয়া রাতেই কক্সবাজারে ফিরে আসে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় দিনে তিনটি জাহাজে মোট ১ হাজার ৫৫৪ জন পর্যটক সেন্টমার্টিন যাচ্ছেন। এর মধ্যে এমভি বারো আউলিয়ায় রয়েছেন ৬১৯ জন, এমভি কর্ণফুলীতে ৩৮৭ জন এবং এমভি টেকনাফে ৫৪৮ জন পর্যটক। তাঁদের দুপুরের মধ্যে দেশের সর্বদক্ষিণের এই দ্বীপে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সুযোগ চালু হওয়ার কথা ছিল। তবে প্রশাসনিক অনুমোদন, নৌযান চলাচলের ছাড়পত্র এবং পরিবেশগত শর্ত পূরণ নিয়ে জটিলতা দেখা দেওয়ায় নির্ধারিত সময়ে জাহাজ চলাচল শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরে অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় চলতি মৌসুমের পর্যটক পরিবহন।
সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত অনুমোদিত তিনটি জাহাজ নিয়মিত চলাচল করবে। এসব জাহাজের সম্মিলিত যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ৩০০ জন। এ বছর প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক যাওয়ার অনুমতি রয়েছে। সে হিসাবে পর্যটকের চাহিদা বাড়লে জাহাজের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে পারে।
এদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নুনিয়ারছড়া ঘাটে তৎপর রয়েছে জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), পুলিশ, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জাহাজে ওঠার আগে পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা ও যাত্রা ব্যবস্থাপনায় নজরদারি করা হচ্ছে।
সমুদ্রপথে সেন্টমার্টিন যাওয়ার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন পর্যটকেরা। একই সঙ্গে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার প্রত্যয় জানিয়েছেন তাঁরা।
চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক আল মাহমুদ বলেন, সেন্টমার্টিন আমাদের দেশের সম্পদ। একজন নাগরিক হিসেবে দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় সেখানে ঘুরতে যাওয়া প্রত্যেক পর্যটকের ভূমিকা রাখা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
তবে ভ্রমণের আনন্দের পাশাপাশি জাহাজের টিকিটের মূল্য নিয়ে অসন্তোষও রয়েছে অনেকের মধ্যে। টিকিটের দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন কয়েকজন পর্যটক।
ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, টিকিটের দাম একটু বেশি মনে হয়েছে। ভ্রমণপিপাসু মানুষের সাধ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভাড়া নির্ধারণ করা হলে ভালো হতো। আশা করি, কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনা করে ভাড়া পুনর্বিবেচনা করবে।
সেন্টমার্টিন ভ্রমণকে পরিবেশবান্ধব ও নিয়ন্ত্রিত রাখতে এবার পর্যটকদের জন্য বেশ কিছু শর্ত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। পাশাপাশি দ্বীপে ভ্রমণের জন্য সংগ্রহ করতে হবে ট্রাভেল পাস এবং কিউআর কোডযুক্ত টিকিট।
কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্বীপে পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি তাঁদের পরিচয় ও যাতায়াতের তথ্য সংরক্ষণ করা। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা।
পর্যটকদের জন্য সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সুযোগ চালু হলেও দ্বীপটির ভঙ্গুর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একাধিক বিধিনিষেধ বহাল রাখা হয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় পর্যটকদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হয়েছে কঠোর নির্দেশনা।
নির্দেশনা অনুযায়ী, রাতে সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করা যাবে না। একই সঙ্গে কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ দ্বীপের কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ বা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচলের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সেন্টমার্টিনের মতো ছোট ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল দ্বীপে পর্যটকের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বীপের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানির ব্যবহার, জ্বালানি সরবরাহ ও শব্দদূষণের ওপর চাপ বাড়ে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের।
তাই শুধু পর্যটকদের জন্য দ্বীপে প্রবেশের সুযোগ চালু করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। পরিবেশ রক্ষায় নির্ধারিত নিয়মগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করাও জরুরি।
সব মিলিয়ে, চলতি মৌসুমে জাহাজ চলাচলের দ্বিতীয় দিনেই তিনটি জাহাজে দেড় হাজারের বেশি পর্যটকের যাত্রা সেন্টমার্টিন ভ্রমণে আগ্রহের চিত্র তুলে ধরেছে। তবে পর্যটনের এই সুযোগ যেন দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়েও সচেতন থাকার আহ্বান সংশ্লিষ্টদের।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম