ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি : শরতের ভোর। আকাশ জুড়ে শান্ত নীলিমা। শিশিরভেজা ধানের ছড়ি হাওয়ায় নাচছে, বাতাসে মাটির ঘ্রাণ মিলছে প্রকৃতির গানেই। হঠাৎ উত্তর আকাশের ধূসর মেঘের আড়াল ভেদ করে এক অপূর্ব দৃশ্য উঁকি দিলো—হিমালয়ের মহিমান্বিত শৃঙ্গ, কাঞ্চনজঙ্ঘা।
দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখা যায় বছরের খুবই বিশেষ কয়েক দিনে। দীর্ঘদিন ধরে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ শুক্রবার ভোরে হঠাৎ খুলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বুড়িরবাঁধ, চিলারং ইউনিয়ন এবং বালিয়াডাঙ্গীর লাহিড়ী ফাঁসিদহসহ নানা এলাকা থেকে মানুষ ছুটে পড়ল দূরের বরফে মোড়ানো চূড়া দেখার জন্য।
সকালবেলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে উঠল ছবি ও ভিডিওতে। কেউ পরিবার নিয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ক্যামেরা হাতে। প্রত্যেকের চোখে একই বিস্ময়—দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে বরফে মোড়ানো হিমালয়।
ঠাকুরগাঁও শহরের বুড়িরবাঁধে দেখা হলো স্কুলশিক্ষক আব্দুল কাদেরের সঙ্গে। আনন্দে চোখের উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে পারছিলেন না তিনি।
“বইয়ে পড়েছি, ছবিতে দেখেছি। কিন্তু চোখের সামনে, এত স্পষ্ট কাঞ্চনজঙ্ঘা—এ যেন এক অলৌকিক দৃশ্য। ছাত্রদের দেখাতে পারায় নিজেকেও আনন্দিত মনে হচ্ছে। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য যেন আমাদের সব ক্লান্তি দূর করে দিল।”
একই এলাকার তরুণী মৌসুমী আক্তার বলেন,
“মনে হচ্ছে সিনেমার দৃশ্য। গল্পে শোনা আর বাস্তবে দেখা—দুইটাই আলাদা। হাত বাড়ালেই যেন স্পর্শ করা যাবে। ছবি তুলি, কিন্তু আসল রঙ আর বিস্ময় ধরে রাখা যায় না। প্রতিটি মুহূর্ত মনে থাকবে চিরকাল।”
বালিয়াডাঙ্গীর ফাঁসিদহ এলাকার কলেজছাত্র রিয়াজুল ইসলাম ফেসবুক লাইভ করতে করতে উত্তেজনায় বললেন,
“অনেকে বিশ্বাসই করে না, বাংলাদেশ থেকে হিমালয় দেখা যায়। আজ প্রমাণ হলো। চোখে দেখার আনন্দ ছবি বা ভিডিওতে পাওয়া যায় না। বরফে মোড়ানো চূড়া, আকাশের নীলিমা, লালচে আভা—সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব অনুভূতি।”
স্থানীয় ফটোগ্রাফার আব্দুস শাহীন জানান,
“সকাল আটটা থেকে নয়টা পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা গেছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। দূরে বরফঢাকা শিখরগুলো যেন আকাশের ক্যানভাসে আঁকা এক জীবন্ত শিল্পকর্ম। প্রতিটি শিখরের রেখা, আলো, ছায়া—মানুষের চোখকে মুগ্ধ করে।”
ঠাকুরগাঁওয়ের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মনোতোষ কুমার দে বলেন,“আজ সকালের মুহূর্তে ঠাকুরগাঁও যেন নতুন রূপে ভাসছে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে মানুষ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছে। ফোনে ছবি তোলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার—সবকিছুই যেন ছোট্ট চেষ্টা প্রকৃতির এই মহিমা ধরে রাখার।”
ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম বলেন,
“গত কয়েক দিন আবহাওয়া ছিল মেঘলা। আজ সকাল থেকে আকাশ পরিষ্কার হওয়ায় কাঞ্চনজঙ্ঘা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। শরতের এই সময়টাতেই এমন সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এটি প্রকৃতির এক অনন্য উপহার।”
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা বলেন,“প্রকৃতির এই অপূর্ব দৃশ্য আমাদের জেলাবাসীর জন্য সৌভাগ্যের। পরিবেশ সচেতনতা ও আবহাওয়া ঠিক থাকলে এমন দৃশ্য বারবার দেখা যায়। মানুষের চোখে আনন্দ ছড়িয়ে দিতে প্রকৃতির এমন সৌন্দর্য অনন্য এক উপহার।”
রিপোর্টার্স২৪/এসএন