স্টাফ রিপোর্টার: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আংশিক অনলাইন ক্লাস চালুর সরকারি উদ্যোগে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। বিশেষ করে রাজধানীর নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পরীক্ষামূলকভাবে এ ব্যবস্থা চালুর ঘোষণার পরই ডিভাইস সংকট, ইন্টারনেট সুবিধা ও বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ-এর দুই শিক্ষার্থীর মা ফারজানা অর্নব বলেন, তার পরিবারের একটি মাত্র স্মার্টফোন রয়েছে, যা তিনি অফিসে ব্যবহার করেন। দুই মেয়ের জন্য আলাদা ডিভাইস কেনা কি এত সহজ? হুট করে অনলাইন ক্লাস চালু করলে আমরা কীভাবে সামলাবো?—প্রশ্ন তার।
একই ধরনের সংকটের কথা জানান মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ-এর এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আফজাল কাওসার। তিন সন্তানের জন্য তিনটি ডিভাইসের প্রয়োজন হলেও তার কাছে রয়েছে মাত্র একটি ফোন। তিনি বলেন, ব্যবসার কাজে আমাকে ফোন সঙ্গে রাখতে হয়। তাহলে বাচ্চারা কীভাবে ক্লাস করবে?
অভিভাবকদের অভিযোগ, অধিকাংশ পরিবারেই একাধিক সন্তানের জন্য পর্যাপ্ত ডিভাইস নেই। পাশাপাশি মোবাইল ইন্টারনেটের উচ্চ খরচ এবং দুর্বল সংযোগ বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ-এর এক অভিভাবক নিগার সুলতানা বলেন, দুই সন্তানের জন্য আলাদা ফোন ও মাসে বড় অঙ্কের ইন্টারনেট খরচ বহন করা কঠিন।
চাকরিজীবী বাবা-মায়েরা আরও বেশি বিপাকে পড়ছেন। তারা সন্তানদের বাসায় রেখে অফিসে গেলে অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণের পাশাপাশি শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও দুশ্চিন্তা তৈরি হচ্ছে। চিকিৎসক দম্পতি সেলিনা রহমান ও আহমেদ সাইদুর জানান, শিশুর হাতে মোবাইল দিয়ে বাইরে থাকলে সে ক্লাস করবে নাকি অন্য কিছুর প্রতি আসক্ত হবে—এটা বড় চিন্তার বিষয়।
শিক্ষক মহলেও রয়েছে অনিশ্চয়তা। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস নেওয়ার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। ভিকারুননিসার এক শিক্ষক জানান, বড় ক্লাসে ৫০-৬০ শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে অনলাইনে যুক্ত করা কঠিন। এতে অনেক শিক্ষার্থী ক্লাস থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বৈষম্য তৈরি করবে।
এদিকে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ঢাকার কিছু নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন সশরীরে ক্লাস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সম্ভাব্য সূচি অনুযায়ী রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার অনলাইন ক্লাস এবং শনি, সোম ও বুধবার সশরীরে ক্লাস নেওয়া হবে।
শিক্ষাবিদরাও এ সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে। বাস্তবতা বিবেচনায় এটি কার্যকর নয়।
অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, করোনাকালে অনলাইন শিক্ষার অভিজ্ঞতা ভালো ছিল না এবং এতে বড় ধরনের শিখন ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। তিনি বিকল্প হিসেবে ক্লাসের সময়সূচি পরিবর্তন ও সশরীরে শিক্ষা চালু রাখার পরামর্শ দেন।
তবে শিক্ষাসচিব আবদুল খালেক জানিয়েছেন, এটি কাউকে বাধ্যতামূলকভাবে চাপিয়ে দেওয়া হবে না। স্কুলগুলোর সক্ষমতা বিবেচনা করে এবং সমস্যাগুলো সমাধান করেই ধাপে ধাপে অনলাইন ক্লাস চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।