| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

পুরোনো চাকা ঘুরছে নতুন আশায়, ঠাকুরগাঁওয়ে পুনর্জীবন পেল মৃৎশিল্প

reporter
  • আপডেট টাইম: অক্টোবর ০৯, ২০২৫ ইং | ০৪:১৮:১৯:পূর্বাহ্ন  |  ২৫৩৭৩৫৬ বার পঠিত
পুরোনো চাকা ঘুরছে নতুন আশায়, ঠাকুরগাঁওয়ে পুনর্জীবন পেল মৃৎশিল্প
ছবির ক্যাপশন: পালপাড়া গ্রাম পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা

সাদ্দাম হোসেন, ঠাকুরগাঁও: ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের পালপাড়া গ্রাম। চারপাশে মাটির ঘ্রাণ আর চাকার ঘুরন্ত শব্দ—এই শব্দেই দিনের শুরু আর শেষ হয় এখানকার মানুষদের। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁরা গড়ে তুলেছেন মাটির নানা পাত্র, ফুলদানি, খেলনা আর শিল্পকর্ম। কিন্তু সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সেই ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প এখন যেন হারিয়ে যাচ্ছিল।

এই বাস্তবতা বদলাতে এক নতুন উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। “মৃৎ শিল্পীদের দক্ষতা উন্নয়ন, মান উন্নয়ন ও বাজারজাতকরণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা”—এই শিরোনামের প্রকল্পে পাল সম্প্রদায়ের শিল্পীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে আধুনিক কৌশল, বিপণনের ধারণা আর নতুন প্রেরণা।

আজ বৃহস্পতিবার (৯অক্টোবর) দুপুরে এই কর্মশালার অগ্রগতি দেখতে পালপাড়া গ্রাম পরিদর্শন করেন ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মেহনাজ ফেরদৌস।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘পালপাড়ার প্রায় দুই শতাধিক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের পণ্য বিক্রি কমে গেছে। এখন সময় এসেছে তাদের শিল্পকে আধুনিক রূপে ফিরিয়ে আনার।’

জেলা পরিষদের অর্থায়নে ২০ জন শিল্পী নিয়ে শুরু হওয়া ১০ দিনের এই প্রশিক্ষণ শেষে তাঁরা আরও ২০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেবেন। প্রশিক্ষণটি চারটি ধাপে পরিচালিত হচ্ছে—প্রথমে মৌলিক ধারণা, এরপর দক্ষতা বৃদ্ধি, উন্নত উৎপাদন, আর সর্বশেষ ধাপে বাজারজাতকরণ।

এই কর্মশালার নেতৃত্বে রয়েছেন আড়ংয়ের সিনিয়র কনসালট্যান্ট চন্দ্র শেখর সাহা, যিনি উদ্বোধনের দিন থেকেই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম তদারকি করছেন। সহকারী প্রশিক্ষক হিসেবে আছেন আশরাফুল শাওন এবং সমন্বয়কের দায়িত্বে মোছা. শরিফা খাতুন।

শরিফা খাতুন বলেন, ‘আগে একটি হাতি বা ফুলদানি পুরোপুরি হাতে বানানো হতো, এখন সেটি এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যাতে একই পণ্য ফুলদানি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। আগে এর দাম ছিল ১০০ টাকা, এখন মান উন্নত হলে বিক্রি হবে ৫০০ টাকায়।’

মৃৎশিল্পীরা এখন তৈরি করছেন আধুনিক নকশার ফুলদানি, মেয়েদের গয়না রাখার বাক্স, এমনকি মাটির গয়না। একসময় বিক্রি না হওয়া চায়ের কাপ, পিরিচ আর কেতলি সেট এখন সাজানো হচ্ছে এমনভাবে, যা হাজার টাকা দামে বিক্রির আশা জাগাচ্ছে।

প্রশিক্ষণার্থী রাধারানী পাল, দ্বিজেন পাল, পঞ্চমী পাল, বৃষ্টি উর্মিলা, রত্না ও অতুল পাল—সবার চোখেই এখন একটাই স্বপ্ন, ‘আমাদের পণ্য শুধু ঠাকুরগাঁও নয়, ঢাকায়, এমনকি দেশের বাইরেও বিক্রি হোক।’

প্রশিক্ষণ শেষে এই পণ্যগুলো জেলা পর্যায়ে প্রদর্শনীর মাধ্যমে জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা হবে। পরবর্তী ধাপে এক মাসব্যাপী আরও বিস্তৃত কোর্সের আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান বিসিক, টিটিসি, এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আড়ং ও অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতায় এই পণ্যগুলো ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজও চলছে।

প্রশিক্ষণার্থী রাধারানী পাল বললেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকে মাটির কাজ করি, কিন্তু আগে কখনো ভাবিনি এটা দিয়েও ভালো আয় করা যায়। এখন বুঝছি—নতুন নকশা, নতুন ভাবনা নিয়ে কাজ করলে এই শিল্প দিয়েও সংসার চলতে পারে।’

দ্বিজেন পাল হাসিমুখে বললেন, ‘আগে ফুলদানি বানাতাম শুধু স্থানীয় হাটে বিক্রি করার জন্য। এখন শেখানো হচ্ছে কীভাবে এটাকে শো-পিসে রূপ দেওয়া যায়। এখন মনে হচ্ছে, আমাদের কাজও বড় দোকানে জায়গা পেতে পারে।’

জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা বলেন, ‘মৃৎশিল্প শুধু একটা পেশা নয়, এটা আমাদের সংস্কৃতির অংশ। এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতেই আমরা আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষক এনে এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছি। এর মাধ্যমে পাল সম্প্রদায়ের জীবনে নতুন দিগন্ত খুলে যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’ মাটির তৈরি পাত্রে নতুন স্বপ্ন গড়ছে ঠাকুরগাঁওয়ের এই গ্রাম। এক সময় যে চাকার ঘূর্ণন ছিল টিকে থাকার প্রতীক, এখন সেটাই হয়ে উঠছে উন্নয়ন আর আত্মমর্যাদার প্রতীক।

রিপোর্টার্স২৪/ প্রীতিলতা

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪