আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি :
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পাকিস্তানের সঙ্গে চলমান বেইলআউট চুক্তির আওতায় পরবর্তী কিস্তির টাকা রিলিজ করার আগে নতুন করে ১১টি শর্ত আরোপ করেছে। এই শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশাল বাজেটের সংসদীয় অনুমোদন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে মূল্য বৃদ্ধি, এবং ব্যবহৃত গাড়ি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ। একসাথে এই শর্তগুলো পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে, বিশেষত যখন দেশটি প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনার মুখোমুখি।
রোববার প্রকাশিত আইএমএফ-এর স্টাফ লেভেল রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় বা আরও বাড়ে, তাহলে তা আইএমএফ প্রোগ্রামের আর্থিক, বৈদেশিক ও কাঠামোগত সংস্কার লক্ষ্যগুলোর জন্য উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি করবে। রিপোর্ট অনুসারে, সাম্প্রতিক সংঘর্ষে ভারত ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদী অবকাঠামোয় হামলা চালালে, তার জবাবে পাকিস্তানও ভারতের সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা পদক্ষেপ নেয়। এই উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত চার দিনের তীব্র ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়ের পর একটি অস্থায়ী সমঝোতায় উপনীত হয়।
নতুন শর্তের মধ্যে অন্যতম হলো, ২০২৬ অর্থবছরের জন্য ১৭.৬ ট্রিলিয়ন রুপির বাজেটের সংসদীয় অনুমোদন। এর মধ্যে উন্নয়ন খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১.০৭ ট্রিলিয়ন রুপি। প্রতিরক্ষা খাতের বাজেটও বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২.৪১৪ ট্রিলিয়ন রুপি, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। সংঘাত পরবর্তী পরিস্থিতিতে সরকার প্রতিরক্ষা বরাদ্দ আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে, যা আইএমএফের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে শর্তের মধ্যে রয়েছে বার্ষিক বিদ্যুৎ শুল্ক পুনঃনির্ধারণ, গ্যাসের অর্ধ-বার্ষিক মূল্য সমন্বয়ের ঘোষণা, ঋণ পরিষেবা সারচার্জের সর্বোচ্চ সীমা তুলে নেওয়া এবং বন্দী বিদ্যুৎ লেভি স্থায়ীকরণের জন্য সংসদীয় অনুমোদন। আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক দু’টিই বিদ্যুৎ খাতে ঘাটতি এবং সরকারী অপশাসনের জন্য বারবার সতর্ক করেছে।প্রাদেশিক পর্যায়েও কর সংস্কার শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যেখানে চারটি প্রদেশকে কৃষি আয়করের আওতায় একটি পূর্ণাঙ্গ কর ব্যবস্থা চালুর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি করদাতাদের শনাক্তকরণ, নিবন্ধন এবং কর আদায়ে দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত।আইএমএফ পাকিস্তান সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে, তারা যেন ২০২৭ সালের পরবর্তী আর্থিক খাত সংস্কার পরিকল্পনার রূপরেখা তৈরি করে এবং ২০২৮ সাল থেকে নতুন নীতিমালার ভিত্তি স্থাপন করে। এ ছাড়া, গভর্ন্যান্স ডায়াগনস্টিক অ্যাসেসমেন্টের ভিত্তিতে একটি সংস্কার পরিকল্পনাও প্রকাশ করতে বলা হয়েছে, যা দুর্নীতির শিকড়ে আঘাত হানার প্রতিশ্রুতি দেয়।
শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে আইএমএফের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশেষ প্রযুক্তি অঞ্চলসহ অন্যান্য কর ছাড় প্রণোদনা ধাপে ধাপে তুলে নিতে হবে। এই মূল্যায়ন-ভিত্তিক পরিকল্পনা ২০২৫ সালের মধ্যেই জমা দিতে হবে।
সবশেষে, একটি তুলনামূলকভাবে গ্রাহক-বান্ধব শর্তে, ব্যবহৃত মোটরগাড়ির বাণিজ্যিক আমদানির ওপর আরোপিত পরিমাণগত সীমা পুরোপুরি তুলে নিতে পাকিস্তানকে সংসদে সংশ্লিষ্ট আইন পাস করার নির্দেশ দিয়েছে আইএমএফ। বর্তমানে তিন বছরের বেশি পুরনো গাড়ি আমদানি নিষিদ্ধ, যা পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
এই ১১টি নতুন শর্ত যুক্ত হওয়ায় পাকিস্তানের মোট শর্তের সংখ্যা দাঁড়াল ৫০-এ। চলতি মাসের মধ্যেই এসব শর্ত বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পূরণ না হলে আইএমএফের পরবর্তী কিস্তি আটকে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। ভারতের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষিতে এই অর্থনৈতিক চাপ আরও গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব