নড়াইল জেলা প্রতিনিধি: কাঠ-মাটির চাকা ঘুরলেও ঘুরছে না ভাগ্যের চাকা। বাপ-দাদার আমল থেকে মাটি দিয়ে হাঁড়ি, ঘড়া, শরা, ঝালোই, কলস, ঘটি, মালসা, বাসনসহ বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র তৈরি করে আসছি। আর সেগুলো বিক্রি করে যে টাকা হতো তা দিয়ে সংসার চালাতাম। এখন বয়স হয়ে গেছে, আগের মতো কাজ করতে পারি না। ওদিকে মাটি ও কাঠের দাম বেড়ে গেছে অনেক। এই কাজ করে যা রোজগার হয় তা দিয়ে সংসার চলে না। আয়-ইনকাম কম হওয়ায় এখন আমাদের ছেলে-পেলেরা এই কাজ করতে চায় না। আগে আমাদের এখানে ৭৫ থেকে ৮০ ঘর পাল পরিবার মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল। এখন ১৫ থেকে ২০ ঘর পাল পরিবার মৃৎশিল্পের কাজ করে। এতে তেমন আয়-ইনকাম না থাকায় বাকিরা অন্য পেশায় চলে গেছে। কেউ ভ্যান চালাচ্ছে, কেউ বিলে-মাঠে কাজ করছে। এভাবেই কথা বলছিলেন সদর উপজেলার চন্ড্রিতলা গ্রামের প্রবীণ মৃৎশিল্পী কালিপদ পাল।
মাটির তৈরি তৈজসপত্র বাঙালির পুরনো ঐতিহ্য। এক সময়ের জনপ্রিয় মাটির তৈরি এসব জিনিসপত্র এখন আর তেমন তৈরি হয় না। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে মৃৎশিল্পীদের হাতে মাটির তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র। তবে পূর্বপুরুষের এ পেশাকে এখনও আঁকড়ে ধরে রেখেছেন কেউ কেউ। তাদের মধ্যে লোহাগড়া উপজেলার নোয়াগ্রাম ইউনিয়নের রায়গ্রামের অমি পাল একজন। তিনি বলেন, এক সময় আমাদের রায়গ্রাম পালপাড়ায় মাটির জিনিসপত্র তৈরিতে দিন-রাত ব্যস্ত থাকতেন প্রতিটি পাল বাড়ির লোকজন। কিন্তু বর্তমানে মৃৎশিল্পের চাহিদা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত আয়-রোজগার না থাকায় দিনে দিনে অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন এ পেশা থেকে। বাড়তি আয়ের আশায় বাপ-দাদার এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন তারা। আগে আমাদের গ্রামে ৫০ থেকে ৬০ ঘর পাল পরিবার এ কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এখন আমি একাই এই কাজ করি, আর কেউ করে না। আমারও বয়স হয়ে গেছে, আর শিখেছি এই কাজ। অন্য কাজ করতে পারি না, তাই বাধ্য হয়ে সংসারের ঘানি টানতে এখনও করে যাচ্ছি।
কাশিপুর ইউনিয়নের শাহাবাজপুর গ্রামের রামগোপাল পাল বলেন, আগে আমাদের গ্রামে ৩০ ঘর পাল পরিবার মৃৎশিল্পের কাজ করত। এখন আমি একাই করি। মাটির তৈজসপত্রের চাহিদা থাকলেও আয় কম। পেটের জ্বালায় আমি এখনও করে যাচ্ছি। তবে এখন বেশি জিনিসপত্র তৈরি করি না। যা তৈরি করি স্থানীয় বাজারে নিজেই বিক্রি করি। বাইরে থেকেও কিছু কিছু জিনিসপত্র কিনে এনে বিক্রি করে সংসার চালাই।
এ বিষয়ে নড়াইল জেলা বিসিকের উপ-ব্যবস্থাপক প্রকৌ. মো. সোলায়মান হোসেন বলেন, মৃৎশিল্পকে একটু আধুনিক করা দরকার। তাদের আধুনিক করার জন্য আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করব। তারা যদি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তাহলে তাদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহযোগিতাসহ সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। যাতে নড়াইলে এই শিল্পটি টিকে থাকে।
রিপোর্টার্স২৪/এসএন