| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

খরচ, কর ও সিন্ডিকেটের ত্রিমুখী চাপে পোল্ট্রি শিল্প; দিশেহারা ক্ষুদ্র খামারিরা

reporter
  • আপডেট টাইম: এপ্রিল ২৪, ২০২৬ ইং | ২৩:৪৪:২৮:অপরাহ্ন  |  ৫৫০ বার পঠিত
খরচ, কর ও সিন্ডিকেটের ত্রিমুখী চাপে পোল্ট্রি শিল্প; দিশেহারা ক্ষুদ্র খামারিরা

স্টাফ রিপোর্টার: দেশের পোল্ট্রি শিল্প বর্তমানে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি, উচ্চ করের চাপ এবং মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র খামারিরা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর নীতিগত সহায়তা না মিললে কয়েক দশকে গড়ে ওঠা এই শিল্প বড় ধরনের ধসের মুখে পড়তে পারে।

প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ৬০ থেকে ৭০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নির্ভরশীল এই খাত এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। একসময় সাধারণ মানুষের প্রধান প্রোটিন উৎস হিসেবে বিবেচিত ডিম ও ব্রয়লার মুরগি ক্রমেই সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি: ভারসাম্য ভেঙে পড়ছে

খাত-সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, গত চার বছরে পোল্ট্রি খাতে উৎপাদন ব্যয়ের সূচক প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২১ সালে ব্যয়ের সূচক ছিল ১০০, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯০-এ। ধারাবাহিকভাবে ২০২২ সালে ১১৫, ২০২৩ সালে ১৪৫ এবং ২০২৪ সালে ১৭০-এ উন্নীত হয়েছে এই সূচক।

বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে গড়ে ১০.৫ থেকে ১১.৫ টাকা খরচ হলেও পাইকারি বাজারে তা বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৭.৫ থেকে ৮.৫ টাকায়। একইভাবে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১৪৬ টাকা, অথচ পাইকারি বাজারে মূল্য ওঠানামা করছে ১৪৫ থেকে ১৪৮ টাকার মধ্যে। ফলে অধিকাংশ খামারি লোকসান গুনেই উৎপাদন চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পোল্ট্রি উৎপাদনের মোট ব্যয়ের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ ব্যয় হয় খাদ্যের পেছনে। পশুখাদ্যের কাঁচামাল আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি দেশের খামারিদের ওপর পড়ছে।

কর ও শুল্কের চাপ: সংকট আরও ঘনীভূত

চলতি বাজেটে কর বৃদ্ধির ফলে খামারিদের সংকট আরও তীব্র হয়েছে। করপোরেট কর ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭.৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ১ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ এবং টার্নওভার কর ০.৬ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে।

এ ছাড়া পশুখাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করায় উৎপাদন ব্যয় খামারিদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। খামারিদের মতে, এই কর ও শুল্ক কাঠামো তাদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাঠপর্যায়ের চিত্র: বন্ধ হচ্ছে খামার

মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিন ধরে খামার পরিচালনা করা অনেক উদ্যোক্তা পুঁজি হারিয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার খামারি আলমগীর হোসেন জানান, খাদ্যের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাবে প্রতিদিন তাকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে ডিম ও মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের দীর্ঘদিনের ভারসাম্য এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। লাভের আশা তো দূরের কথা, মূলধন হারিয়ে অনেক খামারি খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন।

সিন্ডিকেট ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা

খাত-সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন, উৎপাদন থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য খামারিদের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদক কম দামে পণ্য বিক্রি করলেও ভোক্তাদের উচ্চমূল্যে কিনতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি না থাকলে এই সংকট আরও গভীর হবে এবং বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য তৈরির ঝুঁকি বাড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত: নীতিগত সহায়তা জরুরি

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মন্ডলের মতে, খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে না আনলে পোল্ট্রি শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। তিনি পশুখাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে কর ও শুল্ক কমানোর পাশাপাশি দেশীয় বিকল্প খাদ্য উৎপাদনে প্রণোদনা দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) নেতৃবৃন্দের মতে, বিশ্বের অনেক দেশে পোল্ট্রি খাতে কর ছাড় থাকলেও বাংলাদেশে উল্টো উচ্চ কর আরোপ করা হয়েছে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব অনুযায়ী, পোল্ট্রি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে করপোরেট ট্যাক্স ১০ শতাংশে, টার্নওভার কর ০.২ শতাংশে এবং অগ্রিম আয়কর ১ শতাংশে নামিয়ে আনা প্রয়োজন।

ভবিষ্যৎ ঝুঁকি: বিলাসপণ্যে পরিণত হতে পারে ডিম-মুরগি

খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, আসন্ন বাজেটে বিশেষ সুবিধা না থাকলে নতুন বিনিয়োগ কমে যাবে এবং বর্তমান উদ্যোক্তারাও নিরুৎসাহিত হয়ে অন্য পেশায় চলে যেতে পারেন।

এ অবস্থায় ভবিষ্যতে ডিম ও মুরগির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পুষ্টির সহজলভ্য উৎস হিসেবে পরিচিত এই দুই খাদ্যপণ্য তখন সাধারণ মানুষের জন্য বিলাসপণ্যে পরিণত হতে পারে।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪