আশিস গুপ্ত, নয়াদিল্লি: প্রতি বছর এপ্রিল মাস এলেই তপ্ত সমভূমি থেকে বাঁচতে ভারতের লক্ষ লক্ষ মানুষ সিমলা, মানালি, মুসৌরি বা নৈনতালের মতো পাহাড়ি শহরগুলোতে পাড়ি জমান। কিন্তু ২০২৬ সালের গ্রীষ্মকাল এক ভয়াবহ ভিন্ন বার্তা নিয়ে এসেছে। উচ্চ উচ্চতায় অবস্থিত এই শৈলশহরগুলো এখন আর আগের মতো শীতল আশ্রয়স্থল নেই।
ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর হিমাচল প্রদেশ, জম্মু-কাশ্মীর এবং উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি তাপমাত্রা অনুভূত হচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্চের শুরুতেই হিমাচল প্রদেশে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল, যা গত পাঁচ বছরে দেখা যায়নি। এমনকি সিমলা এবং মানালির মতো জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেও গরমের তীব্রতা থেকে রেহাই মেলেনি।
২৬শে এপ্রিল মুসৌরিতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে এই সময়ে তাপমাত্রা ১৭ থেকে ২৩ ডিগ্রির মধ্যে থাকার কথা। একইভাবে নৈনতালেও তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রির ঘরে পৌঁছেছে এবং সিমলা ও মানালিতেও পারদ চড়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক উপরে।
গত কয়েকদিনের তাপমান বিশ্লেষণ করলে ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলের বর্তমান তাপমাত্রার একটি উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। তথ্যানুযায়ী, ২৪ থেকে ২৭শে এপ্রিল পর্যন্ত উত্তর ভারতের সিমলা শহরটি টানা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে স্থির হয়ে আছে। নৈনতালের অবস্থা আরও শোচনীয়, যেখানে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। মানালি, মুসৌরি এবং দেরাদুনেও পারদ ২৭ থেকে ২৯ ডিগ্রির মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যা পাহাড়ের স্বাভাবিক শীতলতার পরিপন্থী।
মহারাষ্ট্রের পশ্চিমঘাটের লোনাভালা এবং করজতের মতো জায়গাগুলোতে গরমের দাপট সবথেকে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে করজতে তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত স্পর্শ করেছে যা সমতলের তীব্র দাবদাহের সমান। দক্ষিণ ভারতের উটি এবং মুন্নারে তাপমাত্রা ২৪ থেকে ২৭ ডিগ্রির মধ্যে থাকলেও, কাশ্মীরের গুলমার্গের মতো উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলেও তাপমাত্রা ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে।
হিমালয় অঞ্চলের এই অস্বাভাবিক উষ্ণতার পেছনে রয়েছে বরফ কমে যাওয়ার এক গভীর সংকট। হিন্দু কুশ হিমালয় অঞ্চলে টানা চার বছর ধরে তুষারপাতের স্থায়িত্ব কমেছে, যা এই বছর গড়ের চেয়ে ২৭.৮% নিচে নেমে গেছে। এর ফলে সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মতো নদীগুলোর উৎসস্থল বিপন্ন হচ্ছে, যার ওপর প্রায় ২৪ কোটি মানুষ সরাসরি নির্ভরশীল।
পাহাড়ের এই প্রচণ্ড দাবদাহ শুধু পর্যটকদের অস্বস্তি বাড়াচ্ছে না, বরং এটি শুষ্ক আবহাওয়া এবং ভয়াবহ দাবানলের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিচ্ছে। শীতে বৃষ্টি বা তুষারপাত কম হওয়ায় পাহাড় এখন অনেক বেশি শুষ্ক এবং দাহ্য হয়ে উঠেছে। তাই সমভূমির তুলনায় পাহাড় বর্তমানে কিছুটা কম গরম থাকলেও, স্বস্তির সেই ব্যবধান ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। পাহাড়ি জনপদগুলো এখন এমন এক প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখোমুখি, যা মোকাবিলা করার জন্য তারা ঐতিহাসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব