| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

আলু এখন ‘গলার কাঁটা’

reporter
  • আপডেট টাইম: মে ০৪, ২০২৬ ইং | ২১:০৮:৫৩:অপরাহ্ন  |  ৩৪৮ বার পঠিত
আলু এখন ‘গলার কাঁটা’
ছবির ক্যাপশন: ফাইল ছবি

রংপুর প্রতিনিধি: রংপুর অঞ্চলে চলতি মৌসুমে আলুর ফলন হয়েছে চোখে পড়ার মতো। মাঠজুড়ে ছিল সোনালি স্বপ্ন, কৃষকের মনে ছিল লাভের আশা। কিন্তু সেই আশা এখন অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। বাজারে আলুর দামে অস্বাভাবিক পতন, সংরক্ষণের সংকট এবং বিপণন ব্যবস্থার দুর্বলতায় চরম সংকটে পড়েছেন এ অঞ্চলের কৃষকেরা। তাদের অনেকের কাছে আলু এখন আশীর্বাদ নয়, বরং বোঝা—একপ্রকার ‘গলার কাঁটা’।

বর্তমানে রংপুরের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে প্রতি মণ আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। কেজিপ্রতি যার দাম দাঁড়ায় ৬ থেকে ৭ টাকা। অথচ কৃষকদের দাবি, এক মণ আলু উৎপাদনে তাদের খরচ হয়েছে অন্তত ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মণ আলু বিক্রিতে তাদের গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের লোকসান। এতে করে শুধু লাভের সম্ভাবনাই শেষ হয়নি, অনেকের পক্ষে মূলধনও ফিরে পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গঙ্গাচড়া, মিঠাপুকুর ও পীরগাছা উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা যায়, আলুর সরবরাহ এত বেশি যে বাজারে এর চাহিদা সামাল দিতে পারছে না। পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, হিমাগারে জায়গার সংকট এবং অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে তারা নতুন করে আলু কিনতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। অনেকেই কম দামে আলু কিনে মজুত করে রেখেছেন, কিন্তু ভবিষ্যতে দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কায় তা বাজারে ছাড়তেও দ্বিধায় আছেন।

এদিকে, যারা আলু বিক্রি না করে বাড়িতে সংরক্ষণ করছেন, তারাও বিপদে পড়েছেন। উপযুক্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে ঘরে রাখা আলুতে দ্রুত পচন ধরছে। অনেক কৃষক জানান, ঘরের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে আলু ১৫-২০ দিনের বেশি ভালো রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে কেউ কেউ রাস্তায় আলু ফেলে দিচ্ছেন, যা একদিকে যেমন আর্থিক ক্ষতির চিত্র তুলে ধরছে, অন্যদিকে খাদ্য অপচয়ের বিষয়টিকেও সামনে আনছে।

গঙ্গাচড়া উপজেলার চেংমারী গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, প্রায় ৩০০ শতক জমিতে আলু চাষ করেছিলেন তিনি। শুরুতে কম দামে বিক্রির প্রস্তাব পাওয়ায় আলু ঘরে তুলে রাখেন। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই সেগুলোতে পচন ধরতে শুরু করে। শেষপর্যন্ত প্রায় ৫০ বস্তা আলু ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

একই গ্রামের আরেক কৃষক পারভিন আক্তার আরও বড় বিপদের মুখে পড়েছেন। নিজের জমির পাশাপাশি বর্গা ও লিজ নিয়ে প্রায় ৫০০ শতক জমিতে আলু চাষ করেন তিনি। এ জন্য গরু বিক্রি করতে হয়েছে, সার ও কীটনাশক কিনতে হয়েছে বাকিতে। ফলন ভালো হলেও বাজারে ক্রেতা না পাওয়ায় তিনি আলুর একটি অংশ হিমাগারে রাখেন এবং বাকিটা বাড়িতে সংরক্ষণ করেন। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও আর্দ্রতায় সেগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এখন ঋণের বোঝা কিভাবে শোধ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কৃষক মাহমুদুল হাসান বলেন, ঘরে রাখা আলুতে ইতোমধ্যেই পোকা ধরতে শুরু করেছে। আর বেশি দিন এভাবে রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজনে কীটনাশক ব্যবহার করে কিছুদিন সংরক্ষণ করা যেতে পারে, কিন্তু সেটিও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় আলুর আবাদ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫১ লাখ ৭৮ হাজার টন। যদিও আগের বছরের তুলনায় উৎপাদন কিছুটা কম, তবুও বাজারে এর প্রভাব পড়েনি। কারণ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখনো অনেক বেশি।

সংরক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। রংপুর বিভাগের ১১৫টি হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ১১ লাখ ২৯ হাজার টন, যা মোট উৎপাদনের মাত্র ২২ শতাংশ সংরক্ষণ করতে সক্ষম। ফলে বিপুল পরিমাণ আলু খোলা জায়গায় বা অনুপযুক্ত পরিবেশে রাখতে হচ্ছে, যা দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

হিমাগার মালিকদের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। তারা জানান, একটি মৌসুমে আলু সংরক্ষণ করতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয়। অনেক সময় বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয়। গত বছর কৃষকরা দাম না পাওয়ায় অনেক আলু হিমাগার থেকেই বের করেননি, এতে তারাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

রপ্তানি খাতেও আশাব্যঞ্জক কোনো অগ্রগতি নেই। কয়েক বছর আগেও রংপুর অঞ্চল থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আলু বিদেশে রপ্তানি হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই হার অনেক কমে গেছে। ফলে দেশীয় বাজারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকারিভাবে আলু ক্রয় অভিযান শুরু করা, হিমাগারের সংখ্যা ও ধারণক্ষমতা বাড়ানো, এবং রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। পাশাপাশি কৃষকদেরও ফসলের বৈচিত্র্য আনার দিকে নজর দিতে হবে, যাতে একটি ফসলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমে।

কৃষি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতি বছর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত আলু আবাদ করার প্রবণতা কৃষকদের ক্ষতির অন্যতম কারণ। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ না করলে ভবিষ্যতেও এমন সংকট দেখা দিতে পারে।

সব মিলিয়ে, মাঠে বাম্পার ফলন হলেও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, সংরক্ষণ সংকট এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় রংপুরের আলুচাষিরা এখন কঠিন সময় পার করছেন। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে, যা দেশের কৃষি অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪