সোহেল ইমাম রাতিন, কুড়িগ্রাম: কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে ঈদের আনন্দ এখন অনেকটাই স্বপ্ন। নদীভাঙনে নিঃস্ব লাখো পরিবারের কাছে কোরবানির পশু তো দূরের কথা, অনেক ঘরে এক কেজি মাংসও জুটবে না। অভাব, ক্ষুধা আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই ঈদ পার করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন চরবাসীরা।
বছরের পর বছর নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষগুলোর কাছে ঈদ যেন বিলাসিতা। সরকারি সহায়তা বলতে ঈদের আগে ১০ কেজি ভিজিএফের চাল ও স্বল্পমূল্যের টিসিবির পণ্য—এতেই সীমাবদ্ধ তাদের উৎসব।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উত্তাল ব্রহ্মপুত্র নদীর বুকে জেগে ওঠা ‘মাঝের চর’-এ নেই কোনো সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। চরটি থেকে যাত্রাপুর নৌকা ঘাটে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। চার বছর আগে জেগে ওঠা এই চরে নদীভাঙনের শিকার অন্তত ৭০টি পরিবার নতুন করে বসতি গড়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই মিললেও থামেনি জীবনের সংগ্রাম।
এই চরে আড়াই বছর ধরে বসবাস করছেন আরমান আলী ও আউলিয়া বেগম দম্পতি। চার সন্তানের সংসার চালাতে আরমান আলী বাইরের জেলার একটি তাঁত কারখানায় কাজ করেন। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও কাজের অনিয়মিততার কারণে এবার ঠিকমতো আয় করতে পারেননি। ফলে সন্তানদের নতুন জামা তো দূরের কথা, এক কেজি মাংস কেনার সামর্থ্যও নেই তার।
আরমান আলী বলেন, “আমি সিরাজগঞ্জে তাঁতের কাজ করি। তাঁত তো বিদ্যুৎ ছাড়া চলে না। এবার বিদ্যুতের সমস্যা বেশি ছিল। তাই ঠিকমতো কাজ করতে পারিনি। গতকাল বাড়িতে এসেছি, হাতে টাকা নেই। ছেলে-মেয়েদের নতুন জামাকাপড় কিনতে পারিনি। এবার মাংস কেনার টাকাও নেই। যদি সন্তানদের রিজিক থাকে, তাহলে হয়তো ঈদের দিন তারা মাংস খেতে পারবে।”
ওই চরের বাসিন্দা জেসমিন আক্তার বলেন, “আমাদের চরে কোরবানি হয় না। ঈদের দিন বাচ্চাদের একটু মাংস খাওয়াতে পারলে ভালো লাগতো।”
মাঝের চরের বাসিন্দা রাজু মিয়া বলেন, “আমাদের এলাকায় কোরবানি হয় না, কারণ সবাই গরিব মানুষ। যাদের কিছু টাকা আছে তারা হয়তো বাজার থেকে মাংস কিনে খাবে। আর যাদের টাকা নেই, তারা মাংস খেতেও পারবে না। কেউ যদি আমাদের চরে গরু কোরবানি করতো, আমরা খুব খুশি হতাম।”
মাঝের চরের বেশিরভাগ মানুষের পেশা কৃষিকাজ। বন্যার সময় ছাড়া চরের জমিতে ধান, কাউন, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করেই কোনোমতে জীবন চলে তাদের। কিন্তু উৎপাদন খরচ বাদ দিলে হাতে থাকে সামান্য আয়। সেই আয় দিয়েই চালাতে হয় পুরো বছরের সংসার।
স্থানীয়রা জানান, বসতি গড়ার তিন বছরেও এই চরে কেউ গরু কোরবানি দিতে পারেননি। গত বছর একটি সংগঠন সেখানে গরুর মাংস বিতরণ করেছিল। এবার যাদের সামর্থ্য আছে, তারা হয়তো একটি ব্রয়লার মুরগি কিনেই কোরবানির মাংসের স্বাদ খুঁজবেন।
শুধু মাঝের চর নয়, সদর উপজেলার পোড়ার চর, আইড়মারী, অষ্টআশির চর, উলিপুরের মুসারচর, জাহাজের আলগা, দইখাওয়ার চরসহ ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদের অববাহিকার সাড়ে চার শতাধিক চরের অধিকাংশ পরিবারের অবস্থাই প্রায় একই। নদীভাঙন, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করতেই কেটে যায় তাদের জীবন।
কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “জেলায় ১৬টি নদ-নদী রয়েছে। প্রায় ৪৬৯টি চরের মধ্যে ২৬৯টি চরে সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। সামনে ঈদ এলেও তাদের মধ্যে ঈদের আনন্দ নেই। কারণ তারা এখন বন্যার শঙ্কা নিয়েই বেশি চিন্তিত।”
তিনি আরও বলেন, “প্রতিবছর অনেক চরে কোরবানি হয় না। বিত্তবানরা যদি নিজেদের আনন্দের পাশাপাশি চরবাসীর পাশেও দাঁড়ান, তাহলে অসংখ্য পরিবারের মুখে হাসি ফুটবে।”
কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ জানান, “ঈদ উপলক্ষে হতদরিদ্র মানুষের জন্য সরকারিভাবে ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি টিসিবির পণ্যও স্বল্পমূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে, যাতে চরাঞ্চলের মানুষ কিছুটা হলেও উপকৃত হন। সমাজের বিত্তবানরা যদি চরবাসীর পাশে দাঁড়ান, তাহলে তাদের কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে।”
রিপোর্টার্স/এসএন