| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ললিতার নিজস্ব ভূগোল

reporter
  • আপডেট টাইম: Jul ১৪, ২০২৬ ইং | ১৭:৪৬:০৮:অপরাহ্ন  |  ৬৩৬ বার পঠিত
ললিতার নিজস্ব ভূগোল

মাধবী তাপসী:

​বাইরের চেনা কোলাহলটা অনেক আগেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। শহরের বুকে কৃত্রিম আলোগুলো এখন ক্লান্ত, কিন্তু হোস্টেলের এই চারকোণা একাকী ঘরটায় এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার।

​ললিতা উঠে গিয়ে জানালার ভারী পর্দাটা টেনে দিল, যাতে বাইরের কৃত্রিম আলো এই মুহূর্তের অনন্ত আর শুদ্ধ অবদমনকে বিন্দুমাত্র নষ্ট করতে না পারে। এই অন্ধকারের একটা নিজস্ব ভাষা আছে, যা কেবল তার একাকীত্বের সাথে কথা বলে। আজ নিজেকে চেনার জন্য কোনো স্ফটিকের অবয়বের প্রয়োজন নেই, তার নিজের প্রতিটি কোষের কামনার্দ্র স্পন্দন, রক্তের ভেতর বয়ে যাওয়া চঞ্চল স্রোতই এখন একমাত্র স্বাক্ষর। সে নিজেই নিজের আলো, নিজেই নিজের অন্ধকার।

​শাড়ির ভাঁজ আলগা করার প্রয়োজন বোধ করল না সে। স্পর্শের তীব্র মাদকতা তো সুতোর বুনন ভেদ করে ত্বকের গভীরে, অতি সূক্ষ্ম রক্তকণিকার ভেতর অবলীলায় পৌঁছে যায়। সুতোর সেই সামান্য ব্যবধান যেন আকাঙ্ক্ষাকে আরও বেশি রহস্যময় করে তোলে। নিজের ডান হাতের তালুটা নিজের কণ্ঠনালীর ওপর আলতো করে চেপে ধরল ললিতা। তার নিঃশ্বাসের প্রতিটি উত্তপ্ত উত্থান-পতন এখন নিজেরই তর্জনীর নিচে বন্দি। বুকে ভেতর এক অস্থির খাঁচায় বন্দি পাখির মতো কাঁপছে তার প্রাণস্পন্দন। শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাওয়া অবশ এক বিদ্যুৎ শিহরণ তাকে বারবার মনে করিয়ে দিল এটা কোনো বাইরের পুরুষের যাযাবর ছোঁয়া নয়, এটা তার নিজেরই শরীরের সাথে নিজের কামনার এক অনিবার্য, চিরন্তন দ্বৈরথ। এই স্পর্শের ওপর অন্য কারও কোনো অধিকার নেই, কোনো ভাগ নেই।

​আজ সারাটা দিন बড্ড ধকল গেছে। জাগতিক নিয়মের বেড়াজালে শরীরটা যেন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছিল। চারপাশের মেকি হাসির মুখোশ আর লৌকিকতার অভিনয় করতে করতে আত্মার ভেতরের ক্লান্তিটা যেন অবশ করে দিচ্ছিল সব। ঘাড়ে আর পিঠের সেই চিলিক মারা তীব্র ব্যথাটাতে যখন নিজেরই কোমল হাত গেল, তখন সেটা আর শুধু ক্লান্তির মর্দন রইল না; হয়ে উঠল এক ধরণের গোপন শরীরী আলাপ, এক অনন্য আত্ম-যৌনতা। নিজের ত্বকের স্পর্শে নিজেই এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করল সে, যা দিনের বেলার সমস্ত অপূর্ণতাকে এক নিমেষে মুছে দেয়।

​হাতের প্রতিটি আঙুল যখন পেশীর খাঁজে গভীর থেকে গভীরে ঢুকে পড়ছে, ললিতার মনে হলো সে তার নিজের শরীরেরই এক নিষিদ্ধ নকশা এঁকে ফেলছে। এমন এক ভূগোল, যার আবিষ্কারক এবং একমাত্র অধিপতি সে নিজেই। এই প্রতিটি চাপ, এই প্রতিটি টান যেন এক গোপন সংকেত, যা কেবল তার নিজস্ব স্নায়ুগুলোই বোঝে এবং এক অলৌকিক পুলকে সাড়া দেয়। শরীরের প্রতিটি ভাঁজ আজ এক একটি কামনার কবিতা, যা সে ছাড়া আর কেউ পড়ার বা ছোঁয়ার অধিকার রাখে না। অন্য কারও স্পর্শ এখানে স্থূল, কেবল নিজের হাতের ছোঁয়াই এখানে পরম পবিত্র এবং তীব্র।

​তার অবাধ্য আঙুলগুলো যখন নিজেরই তলপেটের নরম চামড়া ছুঁয়ে আরও নিচে নেমে যাচ্ছিল, তখন ললিতা এক অদ্ভুত আদিম টানের মুখোমুখি হলো। রক্তকণিকাগুলোর ভেতরে যেন এক অদৃশ্য আগুন জ্বলে উঠেছে, যা তার সমস্ত সত্তাকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে চায়। নিজের শরীরের প্রতিটি খাঁজ আর ভাঁজ আজ তার কাছে কোনো লজ্জার বিষয় নয়, বরং তা এক চরম সত্যের মুখোমুখি হওয়া। সে অনুভব করল, এই তীব্র কামনার দহন কোনো বাইরের মানুষের মায়াবী স্পর্শে নিভে যাওয়ার নয়, এর শেষ তৃপ্তি কেবল নিজেরই হাতের জাদুকরী ছোঁয়ায় সম্ভব। তার নিজের হাতের প্রতিটি সঞ্চালন যেন এক গোপন নদীর স্রোত, যা তাকে এক অতল সুখানুভূতির দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

​ঘরের এই নিস্তব্ধতায় নিজের নিঃশ্বাসের উত্তাপ যখন নিজেরই গলার কাছে, কানের লতিতে এসে লাগল, ললিতার মনে হলো এক অদৃশ্য পরম পুরুষ যেন তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরছে। তার আলিঙ্গন এত তীব্র, অথচ তার কোনো অবয়ব নেই। ললিতা চোখ বুজে ভালো করেই জানে, সেই পুরুষ তো আসলে কোনো বাহ্যিক শরীর নয়, সে নিজেই তারই অবদমিত তীব্র আকাঙ্ক্ষার এক ছায়ামূর্তি, যা তার ভেতরের আদিম সত্তা থেকে জেগে উঠেছে। এই ঘোরের মধ্যে শরীর আর আত্মার মাঝের অন্তরায়টা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছিল। বাতাসে ভাসতে থাকা প্রতিটি ধূলিকণাও যেন এই মুহূর্তে তার শরীরের উত্তাপ শুষে নিচ্ছে। ললিতা অনুভব করল, মানুষ আসলে আজীবন অন্য কারও বুকে যে শান্তি খোঁজে, তা এক মরীচিকা মাত্র। অন্য কোনো মানুষের উপস্থিতি মানেই তো কিছু প্রত্যাশা, কিছু দায়বদ্ধতা আর এক বুক লুকোচুরি। কিন্তু এই মুহূর্তে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন। আসল শান্তি তো লুকিয়ে আছে নিজেরই এই অহংকারহীন, নগ্ন আত্ম-উপলব্ধিতে। তার সমস্ত স্নায়ুতন্ত্র এখন এক তীব্র অথচ নীরব তৃষ্ণার আর্তনাদে কাঁপছে। সে নিজেই নিজের প্রেমিক, নিজেই নিজের উপাস্য।

​বাম হাতটা বুকের ওপর রাখতেই এক অতল গহ্বরের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি হলো তার। হৃৎপিণ্ডের প্রতিটি ধকধকানি যেন এক একটা ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে তার হাতের তালুতে। এই আনন্দ কোনো বাইরের স্থূল প্রাপ্তি বা সামাজিক সম্পর্কের হিসেব-নিকেশ নয়, এ যেন এক গভীর শূন্যতার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নিজেরই কামনার এক প্রচণ্ড উত্তেজনার সুনামি। নিজের সত্তার সাথে নিজেরই এই মনস্তাত্ত্বিক সহবাস, যেখানে তৃপ্তি আর অতৃপ্তির সীমানা একাকার হয়ে যায়। বাইরে থেকে হয়তো তাকে নিথর, নিস্তব্ধ মনে হতে পারে, কিন্তু ভেতরের এই অগ্নুৎপাত কেবল সে নিজেই টের পাচ্ছে। ললিতা আজ তার নিজেরই শরীরের কারাগারে বন্দি এক বিদ্রোহী আত্মা, যে প্রতিটি আত্ম-স্পর্শে, প্রতিটি আঙুলের ছোঁয়ায় নিজের ভেতর এক পরম পুরুষকে আবিষ্কার করছে এবং তার কাছেই নিজেকে সমর্পণ করছে।

​এই কামনার চরম মুহূর্তে এসে ললিতার পিঠের নিচে বিছানার চাদরটা দুমড়ে-মুচড়ে একাকার হয়ে গেল। তার চোখ দুটি বন্ধ, কিন্তু চোখের ভেতরে যেন হাজারটা নক্ষত্র একসাথে খসে পড়ছে। নিজেরই আঙুলের দ্রুততর ও তীব্রতর ছোঁয়ায় সে যখন চরম তৃপ্তির শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছাল, তখন এক অবশ করে দেওয়া সুখের শিহরণ তার পুরো শরীরকে অবশ করে দিল। কোনো বাইরের মানুষের সাহায্য ছাড়াই, নিজের ভেতরের সম্পূর্ণ ভালোবাসাটুকু সে আজ নিজের শরীরকে উজাড় করে দিয়েছে। এই একাকী ঘরের নিস্তব্ধতায় তার অবাধ্য ও তৃপ্ত দীর্ঘশ্বাসটি যেন এক পরম মুক্তির ঘোষণা।

​জানালার ওপাশে একফালি জোছনা এসে পড়েছে শাড়ির আঁচলে, যেন এক অবিনশ্বর আর্তি। কিন্তু সেই জোছনাও আজ ললিতার এই একান্ত নিজস্ব উৎসবের কাছে ম্লান। এই রাত, এই নিস্তব্ধতা আর এই উত্তাপ শুধু তার একান্ত ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য। সমাজের তৈরি করে দেওয়া পবিত্রতা আর অপবিত্রতার সংজ্ঞাগুলো এই অন্ধকারের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। বাইরের পৃথিবী যে নিয়মকে পাপ বলে, এই নির্জনতায় তা-ই যেন এক পরম প্রার্থনায় রূপ নেয়। বাইরের জগতের সমস্ত পুরুষ, সমস্ত জাগতিক নিয়ম, সমস্ত হিসেব-নিকাশ আজ ভীষণ অর্থহীন, ভীষণ তুচ্ছ। নিজের শরীরের ওপর নিজেরই এই নিরঙ্কুশ অধিকারের চেয়ে বড় কামনার উদযাপন আর কী হতে পারে। এই যেন এক পরম স্বাধীনতা, যেখানে কোনো পরনির্ভরশীলতা নেই, কোনো প্রত্যাশার গ্লানি নেই। এখানে হারানোর কোনো ভয় নেই, নেই কাউকে পাওয়ার জন্য আকুল আর্তি।

​ললিতা তার নিজেরই আনন্দের গহীনে ডুব দিতে দিতে ভাবল, মানুষের জীবনের চূড়ান্ত সত্যটাই তো এই একাকীত্ব। তবে এই একাকীত্ব কষ্টের নয়, এ এক গভীর উৎসবের। কেবল যারা নিজের চেতনার আর শরীরের গভীর স্তরে এভাবে ডুব দিতে পারে, নিজের সাথে নিজের এই সম্মোহনী উৎসব কেবল তাদেরই অনুভবগ্রাহ্য। সে নিজেই নিজের পূর্ণতা, সে নিজেই নিজের শেষ গন্তব্য ও পরম মোক্ষ।

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪