| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

৪০তম মৃত্যুবার্ষিকী ২০ আগস্ট

সলঙ্গা বিদ্রোহের মহানায়ক মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ

reporter
  • আপডেট টাইম: অগাস্ট ১৯, ২০২৬ ইং | ১৯:১৭:০৪:অপরাহ্ন  |  ১২৪৬ বার পঠিত
সলঙ্গা বিদ্রোহের মহানায়ক মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া: আজকের তরুণরা অনেকেই কি জানে, দারুল উলূম দেওবন্দ-পড়ুয়া মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ছিলেন আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সভাপতি। যার অধীনে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন শেখ মুজিবুর রহমান। সময়কাল ছিল ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। দলটির প্রথম সভাপতিও যে আরেকজন দেওবন্দ-পড়ুয়া আলেম, সে কথা না হয় আজ অনুল্লেখ্যই রইল।

আবদুর রশীদ তর্কবাগীশই ১৯২৩ সালে মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে রচিত অশ্লীল গ্রন্থ ‘রঙ্গীলা রাসুল’ এবং আর্যসমাজের শুদ্ধি অভিযানের বিরুদ্ধে মুসলমানদের সংগঠিত করে এক দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। সে সময় তিনি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এত বেশি বাহাস (বিতর্কসভা) করেছেন যে, তাঁকে সাধারণ জনগণ ‘তর্কবাগীশ’ (বিতার্কিক) উপাধিতে ভূষিত করেন।

আজকের সুশীল সমাজ কি স্বীকার করবে যে, আপাদমস্তক ধর্মীয় পোশাকে আবৃত এই দেওবন্দি আলেমই সর্বপ্রথম বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন? আজকের শিক্ষিত সমাজ কি জানে যে, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ জাতীয় পরিষদের (জাতীয় সংসদ) প্রথম সভাপতি হিসেবে মাওলানা তর্কবাগীশ সর্বপ্রথম বাংলায় যে সংসদীয় কার্যপ্রণালী প্রবর্তন করেন, তা আজও চালু আছে? জি, তিনিই হলেন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ।

আওলাদে রাসুল, রাসুলনোমা হযরত মাওলানা শাহসূফী সৈয়দ ফতেহ আলী ওয়াইসী (রহ.)-এর অন্যতম খলিফা হযরত মাওলানা শাহসূফী আবু বকর সিদ্দিকী আল-কোরাইশী, ফুরফুরাবী (রহ.)-এর অন্যতম খলিফাও ছিলেন তিনি।

মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ সমগ্র জাতির অহংকার। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। ১৯২২ সালে উপমহাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের রক্তাক্ত অধ্যায় ঐতিহাসিক ‘সলঙ্গা বিদ্রোহে’ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেদিনের তরুণ বিপ্লবী আবদুর রশীদ। তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আশির দশকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অবধি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

উপমহাদেশের আজাদি আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের গোড়াপত্তন যে ভাষা আন্দোলনে, তার গোড়ায় ছিলেন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। যে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা, তারও নেতৃত্ব দিতে কুণ্ঠিত হননি তিনি। বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নামটি তাই অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস।

তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্তসিঁড়ি সলঙ্গা বিদ্রোহের মহানায়ক, ঋণসালিশি বোর্ড প্রবর্তনের পথিকৃৎ, বর্গা আন্দোলনের অবিসংবাদিত কাণ্ডারি, দেশ ও জাতির প্রয়োজনে অকুতোভয় যোদ্ধা এই মহান নেতা ছিলেন আজীবন গণমানুষের নেতা।

বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের নামটি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। উপমহাদেশের আজাদি আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের গোড়াপত্তন যে ভাষা আন্দোলনে, তার গোড়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। যে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা, তারও নেতৃত্ব দিতে কুণ্ঠিত হননি তিনি। তাকে ভুলে যাওয়া মানে হচ্ছে অকৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করা।

তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগে যোগ দেন। মাওলানা তর্কবাগীশ পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।

তিনি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ে সংগ্রামরত ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশি নির্যাতনের সংবাদ পেয়ে প্রাদেশিক পরিষদ থেকে বেরিয়ে এসে মহান ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুসলিম লীগ ত্যাগ করে প্রাদেশিক পরিষদে বিরোধী দল গঠন করেন এবং নুরুল আমিন সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনেন। পরের দিন তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

আওয়ামী লীগের দলীয় সদস্য হিসেবে পাকিস্তান গণপরিষদে ১৯৫৫ সালের ১২ আগস্ট তিনিই প্রথম বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেন। মাওলানা তর্কবাগীশ ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

স্বাধীনতার পর গঠিত হয় বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতি। এ সমিতির প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন মাওলানা তর্কবাগীশ এবং সাধারণ সম্পাদক হন মাওলানা খোন্দকার নাসির উদ্দিন। অতঃপর মাওলানা সাহেব ‘বাংলাদেশ ইসলামী শিক্ষা সংস্কার ও মাদ্রাসা শিক্ষক’ শীর্ষক এক সম্মেলন করেন। এ সম্মেলনে ‘ইসলাম শিক্ষা সংস্কার সংস্থা’ নামে একটি সংস্থা গঠন করে নিজে সংস্কার সভাপতি, মাওলানা আলাউদ্দিন আল-আজহারীকে সাধারণ সম্পাদক এবং সাতজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদকে সদস্য করে একটি কমিটি গঠন করেন। পরে ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের একটি উপকমিটি হিসেবে সংযুক্ত হয় এ সংস্থা।

উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালে মাওলানা তর্কবাগীশ মাদ্রাসা শিক্ষার মাধ্যম করেন বাংলা।

১৯৭২ সালের ৪ অক্টোবর সোভিয়েত রাশিয়ার আমন্ত্রণে স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে প্রথম প্রেরিত মাওলানা তর্কবাগীশের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল রাশিয়া গমন করে। রাশিয়ার রিলিজিয়াস কাউন্সিল কর্তৃক ‘ইসলাম’ শীর্ষক বক্তৃতায় অংশগ্রহণের জন্য মাওলানা তর্কবাগীশ বিশেষভাবে আমন্ত্রিত হন। কাউন্সিলের অধ্যক্ষের সভাপতিত্বে মাওলানা সাহেব দীর্ঘ তিন ঘণ্টা ইসলাম সম্পর্কে বক্তৃতা করেন। তাঁর এ বক্তৃতা উচ্চপ্রশংসিত হয়।

তিনি মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়, লুমুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দেন এবং রাশিয়ার বিভিন্ন শহরে সোভিয়েত রাশিয়ার জনসাধারণ, বিশেষ করে মুসলমানদের কাছে মহান ব্যক্তি ও মহান দেশ হিসেবে তিনি এবং বাংলাদেশ পরিচিতি লাভ করে।

১৯০০ সালের ২৭ নভেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়ার তারুটিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। তিনি বড়পীর হযরত আবদুল কাদির জিলানীর বংশধর। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে দেশপ্রেমের উন্মেষ ঘটে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি জমিদার-মহাজনদের বিরুদ্ধে অসহায় দুধ বিক্রেতাদের সংগঠিত করে দুধের ন্যায্যমূল্য প্রদানে মহাজনদের বাধ্য করেন।

১৯১৯ সালে তিনি খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯২২ সালে ২২ বছর বয়সে তিনি ব্রিটিশবিরোধী ঐতিহাসিক ‘সলঙ্গা আন্দোলন’-এ নেতৃত্ব দেন, যার জন্য তাঁকে কারাভোগ করতে হয়। এই ‘সলঙ্গা আন্দোলন’ ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘রক্তসিঁড়ি’ হিসেবে পরিচিত।

১৯৪৬ সালে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি অবিভক্ত বাংলার এমএলএ হিসেবে তৎকালীন ব্যবস্থাপক পরিষদে পতিতাবৃত্তি নিরোধ, বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা এবং বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমি নির্মাণে যে সব মনীষী কালজয়ী অবদান রেখেছেন, মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি একজন সুসাহিত্যিকও ছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে ‘শেষ প্রেরিত নবী’, ‘সত্যার্থে ভ্রমণে’, ‘ইসলামের স্বর্ণযুগের ছিন্ন পৃষ্ঠা’, ‘সমকালীন জীবনবোধ’, ‘স্মৃতির সৈকতে আমি’, ‘ইসমাইল হোসেন সিরাজী’ ইত্যাদি।

জাতীয় ইতিহাসের এই ব্যক্তিত্ব ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট ইন্তেকাল করেন।

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মরহুম মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার ২০০০’ (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি বেতার ও টেলিভিশনে কোরআন তিলাওয়াতের নিয়ম চালু করেন। এ ছাড়া তিনি কৃষক আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলনসহ দেশ ও জাতির ক্রান্তিকালে সব মুক্তির আন্দোলনে সরাসরি সামনে থেকে জাতির অধিকার আদায়ে সর্বদা সচেষ্ট থেকেছেন। স্বীয় মেধা, প্রজ্ঞা ও যুক্তি দিয়ে ইসলাম ও মুসলিম জাতির জাগরণে তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন।

আমাদের এই প্রজন্মের রাজনীতি আমাদের পূর্বপুরুষ তর্কবাগীশদের মতো মানুষের স্বাধীনতা ও কল্যাণের রাজনীতি হোক। বাক্‌স্বাধীনতা নিশ্চিত হোক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার রাজনীতি হোক সেটাই কামনা।

মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি জানাই গভীরতম শ্রদ্ধা।

(লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক) ই-মেইল: gmbhuiyan@gmail.com


রিপোর্টার্স২৪/ঝুম

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪