| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

বাড়ছে ঢাকার তাপমাত্রা, পরিস্থিতি মোকাবিলায় নানা উদ্যোগ

reporter
  • আপডেট টাইম: অগাস্ট ২১, ২০২৬ ইং | ১৪:৫০:০৪:অপরাহ্ন  |  ৯৮৫১৭৭ বার পঠিত
বাড়ছে ঢাকার তাপমাত্রা, পরিস্থিতি মোকাবিলায় নানা উদ্যোগ

রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয়ের স্বল্পতা, অতিরিক্ত কংক্রিটের ব্যবহার এবং যানবাহনে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহারে দিন দিন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজধানী ঢাকা। বাড়ছে নগরের তাপমাত্রা, তৈরি হচ্ছে ‘হিট আইল্যান্ড’ পরিস্থিতি। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের পাশাপাশি দ্রুত নগরায়ণের চাপ মোকাবিলায় সবুজায়ন, জলাশয় সংরক্ষণ ও নতুন জলাশয় সৃষ্টি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী এবং সবুজ ভবন তৈরির মতো নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে শুধু বৈশ্বিক উষ্ণতা নয়, নগরের নিজস্ব পরিবেশ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নও বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে যানবাহনের কার্বন নিঃসরণ কমানো, গাছপালা বাড়ানো, জলাশয় সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণ নিশ্চিত করা জরুরি।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ এবং অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত যানবাহনের ব্যবহার রাজধানীতে উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলোর অন্যতম। তার মতে, অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত যানবাহন থেকেই কার্বন ডাই অক্সাইডের ৫৬ শতাংশ নির্গত হয়।

তিনি বলেন, দেশে দ্রুত নগরায়ণের কারণে রাজধানীর যানবাহন ব্যবস্থাপনায় সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। জ্বালানি তেলের বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারিচালিত গাড়ি ও হাইব্রিড গাড়ির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে রাজধানীসহ সারা দেশে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির ব্যবহার কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে জোর

দ্রুত নগরায়ণের ফলে রাজধানীতে একের পর এক সুউচ্চ ভবন নির্মাণ হচ্ছে। এসব ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণও নগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আবু নাসের চৌধুরী বলেন, ভবন নির্মাণে ফায়ার ব্রিকসের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। এর পরিবর্তে সলিড ব্লক, হলো ব্লক ও নন-ফায়ার ব্রিকসের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।

ভবনে ব্যবহৃত কাচের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রচলিত গ্লাসের পরিবর্তে নতুন প্রযুক্তির ডিইউজি গ্লাস, স্যান্ডউইচ গ্লাস ও টেম্পার্ড গ্লাসের ব্যবহার বাড়াতে হবে। এসব কাচে তাপ বিকিরণ তুলনামূলক কম হওয়ায় ভবনের ভেতর ও আশপাশের পরিবেশে তাপের প্রভাব কমানো সম্ভব হবে।

এসির ব্যবহারেও পরিবর্তনের পরামর্শ

রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি অফিস ও আবাসিক ভবনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার নিয়েও পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

আবু নাসের চৌধুরী বলেন, বিশেষ করে স্প্লিট ও উইন্ডো এসির পরিবর্তে ভিআরএফ (ভ্যারিয়েবল রেফ্রিজারেন্ট ফ্লো) এবং চিলার এসির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এর মাধ্যমে ভবনের বিদ্যুৎ ব্যবহার ও পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত তাপের চাপ কমানোর সুযোগ রয়েছে।

তিনি জানান, রাজধানীর ভবনগুলোতে ইটের ব্যবহার, গ্লাসের কম্পোনেন্ট এবং এসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতে রাজধানীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাড়ানো হচ্ছে সবুজায়ন ও জলাশয়

ঢাকার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সবুজায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শহরের সড়ক বিভাজক, ফুটপাতের অংশ এবং নতুন স্থাপনার আশপাশে ল্যান্ডস্কেপিং ও আরবরিকালচার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আবু নাসের চৌধুরী বলেন, সবুজ বনায়নের পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানো এবং পরিচর্যার দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন নির্মিত সরকারি-বেসরকারি সুউচ্চ ভবনে ছাদবাগান তৈরির ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। তার মতে, ছাদবাগান শুধু ভবনের সৌন্দর্য বাড়াবে না, নগরের তাপমাত্রা কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

ঢাকা শহরে জলাশয়ের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ছোট ছোট পুকুর, লেক ও অন্যান্য জলাশয় তৈরি এবং বিদ্যমান জলাশয় সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি এগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে রাজধানীর উষ্ণতা কমানোর পাশাপাশি নগরবাসীর বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে অস্বাভাবিকতা

বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে রাজধানীতে বৃষ্টিপাতের ধরনেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কখনো অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, আবার কখনো দীর্ঘ সময় বৃষ্টিহীনতা, তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা এবং ঋতুর সময়সীমায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

এর ফলে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও দৈনন্দিন চলাচল।

সরকারি-বেসরকারি ভবনে ছাদবাগান ও সবুজায়নের ওপর জোর দেওয়ার কথা জানিয়ে আবু নাসের চৌধুরী বলেন, সরকারি অফিস-আদালত ও বাসভবনে গাছের পরিচর্যা এবং সবুজায়নের বিষয়ে সরকারের নজর রয়েছে। তবে বেসরকারি খাতের স্থাপনাগুলোতে, বিশেষ করে শপিং মল ও আবাসন প্রকল্পে সবুজায়নের ক্ষেত্রে এখনও উদাসীনতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে।

পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।

গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সমন্বয়) সুমন চাকমা জানান, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত গণপূর্ত মেট্রোপলিটন জোনে ৫ লাখ ৬২ হাজার বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আরবরিকালচার গণপূর্ত বিভাগে ৫ লাখ ৫২ হাজার এবং মেট্রোপলিটন জোনের আরবরিকালচার ছাড়া অন্যান্য গণপূর্ত বিভাগে ১০ হাজার বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি জানান, চলতি বছরের ১৬ আগস্ট পর্যন্ত আরবরিকালচার গণপূর্ত বিভাগে ২২ হাজার ৩৯২টি এবং এসবি নগর গণপূর্ত বিভাগের জোন-৩ এলাকায় ১৫০টি বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। এসব গাছের মধ্যে রয়েছে ফলজ, বনজ ও ঔষধি বৃক্ষ।

এ ছাড়া গণপূর্ত ঢাকা জোনে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ১০ হাজার বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৫ হাজার ৩৩৯টি বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে।

সৌরবিদ্যুতে বাড়ছে গুরুত্ব

রাজধানীর তাপমাত্রা ও কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত জ্বালানির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সুমন চাকমা জানান, প্রচলিত বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ চলছে। ঢাকা গণপূর্ত ই/এম বিভাগের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে সোলার প্যানেল স্থাপন করে ৪ হাজার ৬২২ দশমিক ৪৮ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে।

গণপূর্ত বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) আশরাফুল হক বলেন, দেশের সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত ও বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত এসি ও ফ্রিজ ক্লোরোফ্লোরোকার্বন (সিএফসি) মুক্ত হওয়া জরুরি। বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত অধিকাংশ এসি ও ফ্রিজ সিএফসি মুক্ত হওয়ায় ওজোন স্তরের ক্ষতির আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম।

তিনি বলেন, প্রচলিত বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল, গ্যাস ও ক্রুড ওয়েলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। এসব জ্বালানি থেকে কার্বন নিঃসরণ হয়। কার্বন নিঃসরণ কমাতে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে।

সৌর প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও কার্বন নিঃসরণ—দুটিই কমানো সম্ভব।

‘সবুজ সিটি’ হিসেবে ঢাকাকে গড়ার লক্ষ্য

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী জানান, ঢাকাকে বসবাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ করছেন।

তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোর পরিবেশবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ঢাকাকে প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব সবুজ নগরীতে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ ক্ষেত্রে এশিয়ার সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ও জাপানের টোকিওর মতো শহরগুলোকে উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয়ের স্বল্পতা, অতিরিক্ত কংক্রিট, যানবাহনের কার্বন নিঃসরণ এবং সবুজ এলাকার সংকোচন—সব মিলিয়েই ঢাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী, পরিকল্পিত সবুজায়ন, জলাশয় বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ, ছাদবাগান, সৌরবিদ্যুৎ এবং পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীকে আরও বাসযোগ্য, সহনীয় ও সবুজ নগরীতে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।


সূত্র: বাসস


রিপোর্টার্স২৪/ঝুম

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪