রিপোর্টার্স ডেস্ক: বিয়ের তারিখ আগেই চূড়ান্ত হয়েছিল। দুই পরিবারেই চলছিল বিয়ের প্রস্তুতি। নিজেদের ভবিষ্যৎ সংসার নিয়ে স্বপ্ন বুনছিলেন আগামী চক্রবর্তী ও তার প্রেমিক অদিত কর। কিন্তু সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী দুই মাদকাসক্ত যুবকের নৃশংসতায় মা-বাবা ও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে খুন হয়েছেন আগামী চক্রবর্তী। প্রেমিকার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকে ভেঙে পড়েছেন অদিত কর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগামীকে উদ্দেশ করে দেওয়া এক পোস্টে অদিত লিখেছেন, ‘আমার জীবনের শেষ সম্বলটাও শেষ হয়ে গেল।’
আগামী চক্রবর্তী রংপুর জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলের মেয়ে। গত শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে রংপুর নগরীর কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ওরফে প্রার্থী (২৫) এবং ছোট ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তী ওরফে প্রিয়ম (১২)-এর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের তদন্তে দাবি করা হয়েছে, দুই মাদকাসক্ত যুবক মাদক সেবনে বাধা পাওয়ায় প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করে। পরে পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকেও হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
আগামী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অদিত করের সঙ্গে তাঁর বিয়ে চলতি বছরের শেষ দিকে হওয়ার কথা ছিল। দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের প্রস্তুতিও চলছিল।
নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাত্র দুই দিন আগে, বুধবার, অদিতের সঙ্গে শেষবার দেখা হয়েছিল আগামীর। ওই দিনের স্মৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরে অদিত লিখেছেন, ‘খুব করে বলল সে দিন—আমরা তো কখনও কাপল পিক তুলিনি, চলো আজকে তুলি।’ আগামীর অনুরোধে সেদিন দুজন একসঙ্গে ছবি তোলেন। তখনও কেউ জানতেন না, সেটিই হবে তাঁদের শেষ ছবি।
ওই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে অদিত আরও লিখেছেন, ‘এটা বুধবারের ছবি। চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকব।’
অদিতের এক বন্ধু জানান, বুধবারই তাঁর সঙ্গে আগামীর শেষ দেখা হয়। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁদের মধ্যে কথা হয়। এরপর আর আগামীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি অদিত। পরে পরিবারের কাছ থেকে খবর পেয়ে শনিবার গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির তালা ভেঙে চারজনের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি জানতে পারেন তিনি।
বন্ধুটির দাবি, হবু স্ত্রী আগামীকে হারিয়ে অদিত ‘ট্রমাটাইজড’ হয়ে পড়েছেন। কয়েক দিন আগেই নিজের বাবাকেও হারিয়েছেন তিনি। তাঁর পুরো দুনিয়াই ছিল হবু স্ত্রী আগামীকে ঘিরে। এমন অবস্থায় আগামীর মর্মান্তিক মৃত্যুতে তিনি একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেছেন।
এদিকে রোববার সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, অভিযুক্ত দুই যুবক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলের বাড়ির ছাদে বসে মাদক সেবন করছিলেন। তাঁদের মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় গণপতি চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁদের বিরোধ হয়। একপর্যায়ে তাঁর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাঁকে হত্যা করা হয়।
পুলিশের দাবি, এরপর নিজেদের পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় গণপতির স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকেও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে অভিযুক্তরা। পরিবারের সদস্যদের মরদেহের কোনোটি সিঁড়ির কাছে, আবার কোনোটি খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়।
পরিবারের দাবি, হত্যার পর মৃতদের মুখে দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছিল।
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা বাড়ির বাথরুমে গিয়ে গোসল করে। এরপর খেজুর ও শসা খায়। পরে হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর উদ্দেশ্যে বাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখে তারা।
তবে পুলিশের তদন্তে শেষ পর্যন্ত সামনে আসে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ বলে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। সূত্র: এই সময় অনলাইন
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব