ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: পাকিস্তানের বৈদেশিক তারল্য এখন মূলত দুটি ভঙ্গুর অবলম্বনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে-বারবার নেওয়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর আমানত পুনঃতফসিল বা মেয়াদ বাড়ানো। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক-দুই দিক থেকেই এসব ব্যবস্থার বড় মূল্য দিতে হচ্ছে দেশটিকে।
দেশটির রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ এবং গবেষক ড. নিয়াজ মুর্তাজার মতে, পাকিস্তানের শাসকেরা অর্থনৈতিক সক্ষমতার চেয়ে ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে প্রায় দেউলিয়া রাষ্ট্রটির অর্থায়নে আগ্রহী করে তুলছেন। কিন্তু এসব সহায়তাকে টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলেও ব্যক্তিগত স্বার্থে তা ব্যবহারে তারা সফল।
ফলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি রপ্তানিনির্ভর না হয়ে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। ডলার আয় করার চেয়ে দ্রুত ব্যয় করায় বারবার বৈদেশিক মুদ্রার সংকট তৈরি হচ্ছে।
চলতি শতকে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সুযোগ নষ্ট করেছিলেন পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান পারভেজ মোশাররফ-এমন দাবি করে মুর্তাজা বলেন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর তার শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা, ঋণ পুনর্গঠন, বিদেশি বিনিয়োগ ও পোর্টফোলিও বিনিয়োগ মিলিয়ে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাহিত হয়েছিল। কিন্তু শক্তিশালী রপ্তানি ভিত্তি তৈরি হয়নি।
বরং এসব অর্থ ভোগ, আমদানি ও আবাসন খাতে ব্যয় হয়ে সম্পদের মূল্যবৃদ্ধি ঘটায়। ২০০৮ সালে জিডিপির ৮ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছে যায় চলতি হিসাবে ঘাটতি, যা বড় ধরনের সংকট তৈরি করে।
পরবর্তীতে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) জ্বালানি ও সড়ক খাতে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন করে। এতে জ্বালানিসংকট কিছুটা কমলেও টেকসই রপ্তানি ভিত্তি গড়ে ওঠেনি। ২০১৮ সালে আমদানি বৃদ্ধির ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশে পৌঁছে যায়। মূলত এরপর পাকিস্তান আইএমএফ ঋণ ও বিভিন্ন রাষ্ট্রের আমানতের ওপর আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
মুর্তাজার মতে, ২০১৬ সালে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের রিজার্ভের ৩৬ শতাংশের সমপরিমাণ বিদেশি রাষ্ট্রের আমানত ছিল, যা ২০২৩ সালের শুরুতে প্রায় ৬০০ শতাংশে পৌঁছে যায়।
বর্তমানে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার আইএমএফ ঋণ, সৌদি আরবের ৮ বিলিয়ন ডলার এবং চীনের ৪ বিলিয়ন ডলারের আমানত রয়েছে বলে তার লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, এসব আমানত বা ঋণ সরাসরি উৎপাদন, কর্মসংস্থান কিংবা রাজস্ব আয়ের প্রকল্পে ব্যবহৃত হয় না। বরং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবেলায় এগুলো নেওয়া হয়। ফলে রিজার্ভ বাড়লেও অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর হচ্ছে না।
তবে পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে বলেও মনে করেন পাকিস্তানি এই গবেষক। তার মতে, বাংলাদেশের বিদেশি রাষ্ট্রের এমন আমানত নেই এবং আইএমএফের ঋণ রিজার্ভের তুলনায় অনেক কম। একই সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যেখানে পাকিস্তানের রপ্তানি প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংবাদ মাধ্যম ডনের এক প্রতিবেদনে তিনি দাবি করেন, গত চার বছরে পাকিস্তানের বর্তমান ব্যবস্থার প্রধান অর্জন স্থিতিশীলতা ধরে রাখা। কিন্তু শক্তিশালী রপ্তানি ভিত্তি ও টেকসই প্রবৃদ্ধি না থাকায় সেই স্থিতিশীলতাই শেষ পর্যন্ত স্থবিরতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
আইএমএফের শর্ত এবং বিদেশি রাষ্ট্রের আমানতের ওপর নির্ভরতা পাকিস্তানের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে বলেও তিনি মনে করেন।
সব মিলিয়ে পাকিস্তানের সামনে দুটি কঠিন পথ রয়েছে-ধীর প্রবৃদ্ধি নিয়ে এগিয়ে গিয়ে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি নেওয়া, অথবা আমদানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে আবারও বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে পড়া। এই দুই ভঙ্গুর অবলম্বনের ওপর দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের ‘বেইলআউট রাষ্ট্র’ আর কতদিন টিকে থাকতে পারবে বলেও প্রশ্ন রাখলেন তিনি।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব