ফরিদপুর প্রতিনিধি: কাল বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ অভিযানে যাওয়ার আগে মুঠোফোনে মাকে বলা সেনাসদস্য তিতাস শেখের (২৮) শেষ কথাগুলো এখন বারবার মনে পড়ছে মা রেখা বেগমের। মায়ের কাছে দোয়া চেয়ে অভিযানে যাওয়া ছেলেটি আর ফিরে আসেননি। কক্সবাজারের টেকনাফে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত তিতাসকে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় ফরিদপুরের নগরকান্দায় পারিবারিক গোরস্থানে নানীর কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে।
শুক্রবার বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে তিতাসের মরদেহ নগরকান্দা সরকারি মহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমি মাঠে আনা হয়। সেখানে পদ্মা সেনানিবাসের ১৫ আর-ই রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের মেজর সোহেলের নেতৃত্বে সেনাসদস্যরা মরদেহ গ্রহণ করেন। পরে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাড়িতে।
তিতাসের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা ভিড় করেন। এ সময় মা রেখা বেগম, বাবা আফজাল শেখ ও স্ত্রী সুমাইয়া আক্তারসহ পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
শুক্রবার বাদ মাগরিব লস্করদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে তিতাসের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার আগে নিহতের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এ সময় তিতাসের ইউনিটের কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন সাজিদসহ সেনাসদস্য, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় গোরস্থানে। সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে নানীর কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। পরে ক্যাপ্টেন সাজিদের নেতৃত্বে সেনাসদস্যরা সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করেন। কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি সামরিক আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়।
ছেলের মৃত্যুর পর থেকে শোকে ভেঙে পড়েছেন মা রেখা বেগম। গত বুধবার রাতে মুঠোফোনে মাকে অভিযানে যাওয়ার কথা জানিয়ে তিতাস বলেছিলেন, ‘আগামীকাল বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ ছেলের জন্য দোয়া করেছিলেন মা। কিন্তু সেটিই যে তাঁদের শেষ কথা হবে, তা বুঝতে পারেননি তিনি। বৃহস্পতিবার রাতে ছেলের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর থেকে কান্না থামছে না তাঁর।
স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন স্ত্রী সুমাইয়া আক্তারও। চার বছর আগে পাশের গ্রামের সুমাইয়ার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তিতাসের। তাঁদের কোনো সন্তান নেই। আগামী ডিসেম্বর মাসে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। সেই অপেক্ষায় ছিলেন সুমাইয়া। কিন্তু ডিসেম্বর আসার আগেই স্বামীকে হারাতে হলো তাঁকে।
তিতাসের বাবা আফজাল শেখ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য। বাবার পথ অনুসরণ করে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন তিতাস। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তাঁর ছোট ভাই আকরাম হোসেনও বর্তমানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত। পরিবারের দুই প্রজন্মের সদস্যদের সেনাবাহিনীতে যুক্ত থাকার মধ্যে তিতাসের এমন মৃত্যুতে স্বজনদের পাশাপাশি শোকাহত হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযান চলছিল। এ সময় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলি তিতাসের বুকের বাঁ পাশের ওপরের অংশে লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসামরিক অ্যাম্বুলেন্সে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) পাঠানো হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
তিতাস সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য ছিলেন। তিনি টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে যৌথবাহিনীর অভিযানে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে তাঁর মরদেহ রামু সিএমএইচে রাখা হয়। সামরিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুক্রবার হেলিকপ্টারে করে মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়।
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুক্রবার বিকেলে হেলিকপ্টারে করে তিতাসের মরদেহ নগরকান্দায় পৌঁছায়। পরে গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার পর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থানীয় গোরস্থানে নানীর কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ