রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক:
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত শহীদ পরিবারের মধ্যে সরকারি সহায়তা নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র দ্বন্দ্ব। দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন শহীদের মা-বাবা এবং স্ত্রী। একপক্ষের অভিযোগ অন্যপক্ষ বেশি অর্থ সহায়তা পেয়ে যাচ্ছে, আর এই দ্বন্দ্ব মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এতে সহায়তা কার্যক্রমে তৈরি হচ্ছে জটিলতা, বিলম্বিত হচ্ছে এককালীন অর্থসহ মাসিক ভাতা বিতরণও।
সরকার জুলাই শহীদ পরিবারকে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে এককালীন ৩০ লাখ টাকা অর্থ সহায়তা দিচ্ছে। এর মধ্যে গত অর্থবছর (২০২৪-২০২৫)-এ দেওয়া হয়েছে প্রথম কিস্তির ১০ লাখ টাকা এবং চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২০২৬) দেওয়ার কথা বাকি ২০ লাখ টাকা। পাশাপাশি প্রতিটি শহীদ পরিবার মাসিক ২০ হাজার টাকা করে ভাতাও পাবে। এখন পর্যন্ত গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে ৮৪৪ জন শহীদের নাম।
কিন্তু এই সহায়তা বিতরণে জটিলতা তৈরি হয়েছে মূলত উত্তরাধিকার বণ্টন আইন কেন্দ্র করে। মুসলমানদের ক্ষেত্রে সহায়তা বিতরণ করা হচ্ছে ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১’ অনুযায়ী আর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে ‘হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, ১৯৫৬’ অনুযায়ী। কিন্তু এ ভাগাভাগি নিয়ে মা-বাবা ও স্ত্রী—দুই পক্ষেরই অভিযোগ ও আপত্তি।
দুই ভাগে বিভক্ত শহীদ পরিবার:
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, শহীদ পরিবারের সদস্যরা নিজেরা হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুক মেসেঞ্জারে আলাদা গ্রুপ খুলে দলবদ্ধভাবে দাবি জানাচ্ছেন। শহীদের স্ত্রীদের আলাদা গ্রুপ, আবার মা-বাবারও আলাদা গ্রুপ তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো সময় একসঙ্গে এসে দলবদ্ধভাবে দাবিও জানাচ্ছেন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম (বীর প্রতীক) বলেন, “কোনো শহীদের বউ এসে বলছেন, আমার শ্বশুর-শাশুড়ি আমাকে ভাগ দিতে চাচ্ছেন না। আবার মা-বাবা বলছেন, বউ তো আবার বিয়ে করতে পারে, কিন্তু আমরা সন্তান হারিয়েছি। কেউ কেউ আসছে অর্ধেক করে দিতে বলেন। এই জটিলতার শেষ নেই।”
তিনি আরও বলেন, “টাকা-পয়সা আর স্বার্থের লড়াইয়ে শহীদ পরিবারের কেউ কেউ শহীদ হওয়ার মহিমা ভুলে গেছেন। অথচ সরকারের মূল লক্ষ্য শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করা।”
সহায়তা কার্যক্রমে বিলম্ব:
এ জটিলতার কারণে প্রথম কিস্তির অর্থ এখনও শতভাগ বিতরণ সম্ভব হয়নি। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৭৭৪ জন শহীদ পরিবারকে প্রথম কিস্তির টাকা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু দুই শতাধিক শহীদের উত্তরাধিকার জটিলতার কারণে প্রায় ৭০ জনের পরিবার এখনো পাননি। ফলে দ্বিতীয় কিস্তির ২০ লাখ টাকা বিতরণ শুরু করা যাচ্ছে না।
মহাপরিচালক মো. মশিউর রহমান বলেন, “মা-বাবা ও স্ত্রী উভয়েই নিজেদের মতো করে দাবি তুলছেন। আমাদের কাজ বেড়ে গেছে, সময়ও বেশি লাগছে।”
সচিব ইসরাত চৌধুরী বলেন, “আমরা নিয়ম অনুযায়ী সহায়তা দিচ্ছি। কিন্তু তারপরও দুই পক্ষেরই কেউ কেউ সন্তুষ্ট হচ্ছেন না। বিশেষ করে স্ত্রীদের মধ্যে আপত্তি বেশি।”
তিনি জানান, “বাবা-মা একপক্ষে এসে দাবি করছেন, আবার স্ত্রী আলাদা এসে দাবি করছেন। অনেকে আবার বিয়ের প্রমাণ দেখিয়ে নতুন করে দাবি করছেন।”
বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্ব মেটাতে ব্যস্ত মন্ত্রণালয়:
উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বলেন, “শহীদ পরিবারের কেউ কেউ অসাধু লোকজন ও কনট্রাক্টরদের মাধ্যমে লবিং করছেন। কেউ কেউ টাকার ভাগ নিয়ে শর্ত দিচ্ছেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের প্রতিদিন ওয়ান-টু-ওয়ান বসে সমস্যার সমাধান করতে হচ্ছে। ফলে দ্রুত কাজ এগোচ্ছে না।”
উপদেষ্টা বলেন, “টাকা-পয়সা আর স্বার্থের সংঘাত আসার পর শহীদের গৌরব কমে গেছে। সরকারের মূল লক্ষ্য এই মহিমা ধরে রাখা ও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।”
আহতদের সহায়তা কার্যক্রম:
শহীদ পরিবারের পাশাপাশি আহতদের জন্যও সরকারি সহায়তা চালু আছে:
* **ক-শ্রেণির (অতি গুরুতর আহত)**: এককালীন ৫ লাখ টাকা (ইতোমধ্যে ২ লাখ দেওয়া হয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাকি ৩ লাখ), মাসিক ভাতা ২০ হাজার টাকা
* **খ-শ্রেণির (গুরুতর আহত)**: এককালীন ৩ লাখ টাকা (ইতোমধ্যে ১ লাখ দেওয়া হয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাকি ২ লাখ), মাসিক ভাতা ১৫ হাজার টাকা
* **গ-শ্রেণির (সাধারণ আহত)**: এককালীন ১ লাখ টাকা (ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে), মাসিক ভাতা ১০ হাজার টাকা
তাদের জন্য আজীবন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা, বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ ও পুনর্বাসন সুবিধা রাখা হয়েছে। শহীদ পরিবারের সক্ষম সদস্যদের জন্য সরকারি/আধা-সরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকারও থাকবে।
কাজ দ্রুত শেষের উদ্যোগ:
মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত অ্যাকাউন্ট ও তথ্য সংগ্রহ করে টাকা সরাসরি সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠাতে। আগামী সপ্তাহ থেকে অন্তত একটি বিভাগে ভাতা বিতরণ শুরু করার চেষ্টা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “কে কোন শ্রেণিতে যাবেন, সেটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঠিক করবে। আমরা নিয়ম অনুযায়ী সহায়তা দেই, কিন্তু তারপরও অনেকে সেটি মানতে চান না।”
মহাপরিচালক মশিউর রহমান জানান, “শহীদের একাধিক উত্তরাধিকার থাকায় একেকজনের জন্য আলাদা অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা পাঠাতে হচ্ছে। এতে কাজের চাপ ও সময় দুটোই বেড়েছে।”
টাকা-পয়সা ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে শহীদ পরিবারের একাংশ নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে সরকারি সহায়তা বিতরণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য শহীদদের আত্মত্যাগের মহিমা ধরে রাখা হলেও বাস্তবে মা-বাবা ও স্ত্রীদের দ্বন্দ্ব মেটাতেই সবচেয়ে বেশি সময় যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
রিপোর্টার্স২৪/এস