আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের ধর্মীয় শহর ‘ধর্মস্থলে’ শত শত নারীকে ধর্ষণের পর মাটিচাপা দেওয়ার অভিযোগ তোলা সেই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার (২৩ আগস্ট) নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসআইটি কর্মকর্তা জানান, ‘মিথ্যা বলার জন্য’ ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগটি ঘিরে রাজ্যটিতে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
ধর্মস্থল মন্দিরের শহর হিসেবে পরিচিত। হিন্দুদের পবিত্র ত্রিমূর্তীর শিবের অবতার মঞ্জুনাথ স্বামীর শতাব্দী প্রাচীন মন্দিরের আবাসস্থল এই শহর। এখানে প্রতিদিন হাজারও তীর্থযাত্রী ভ্রমণ করেন। মনোরম এই শহরের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন প্রাচীন মন্দিরটির একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তিনি দাবি করেন, ধর্ষণের পর হত্যার শিকার শত শত নারীর মরদেহ মাটিচাপা দিতে তাকে বাধ্য করা হয়েছে। সূত্র: বিবিসি
মন্দিরের সাবেক পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলেন, ১৯৯৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কাজ করার সময় তাকে এসব কাজ করতে হয়েছিল। নারীদের প্রথমে নির্মমভাবে ধর্ষণ, পরে হত্যা করা হয়। যাদের বেশিরভাগই ছিলেন অপ্রাপ্তবয়স্ক।
গত জুলাইয়ে তিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ দেন এবং ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি রেকর্ড করেন। আদালতে হাজির হওয়ার সময় ব্যাগ থেকে একটি মানুষের খুলি বের করে তিনি দাবি করেন, এটি তারই পুঁতে রাখা কোনো ভুক্তভোগীর দেহাবশেষ।
তার এই অভিযোগ যাচাই করতে সরকার একটি বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠন করে। তারা জানায়, খুলিটি তার চিহ্নিত জায়গা থেকে উদ্ধার হয়নি। শনিবার তাকে ‘মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার অভিযোগে’ গ্রেপ্তার করা হয়।
দলটি কয়েক সপ্তাহ ধরে ধর্মস্থল ও আশপাশে খননকাজ চালিয়েছে। মন্দিরের সাবেক পরিচ্ছন্নতাকর্মী মোট ১৩টি জায়গা চিহ্নিত করেছিলেন- যার কিছু ঘন বন আর বিষধর সাপে ভরা দুর্গম এলাকা।
এসআইটির কর্মকর্তারা বলেন, দুটি জায়গা থেকে মানবদেহের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি খুলি ও প্রায় ১০০টি হাড়ের টুকরো। এগুলো কার দেহাবশেষ, তা এখনও ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায়নি।
এই অভিযোগগুলো মন্দিরের বংশগত প্রশাসক- প্রভাবশালী হেগড়ে পরিবারের ওপরও চাপ সৃষ্টি করেছে। এক বিবৃতিতে মন্দিরের প্রধান প্রশাসক বীরেন্দ্র হেগড়ে (ভারতীয় সংসদের উচ্চকক্ষের একজন সাংসদ) বলেন, ‘ধর্মস্থল এবং এর আশেপাশে ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক মৃত্যুর অভিযোগের তদন্তের জন্য এসআইটি নিয়োগের জন্য মন্দির কর্তৃপক্ষ সরকারকে ধন্যবাদ জানায়। আমরা ইতোমধ্যেই তদন্তের জন্য পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছি। আমাদের বিচার বিভাগ, তদন্ত সংস্থা এবং ভারতের সংবিধানের ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।’
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সাবেক এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দাবিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। হেগড়ে বলেন, ‘চিরকালের জন্য সত্য বেরিয়ে আসা উচিত।’
এদিকে ওই ব্যক্তির অভিযোগ ঘিরে কর্ণাটক রাজনীতিতেও তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। সদ্য শেষ হওয়া বিধানসভা অধিবেশনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বিরোধী বিজেপি নেতারা অভিযোগ করেন, এটি একটি ‘অপপ্রচার’, যার উদ্দেশ্য হলো কোটি ভক্তের ধর্মীয় আবেগকে আঘাত করা।
অন্যদিকে রাজ্যের শাসক কংগ্রেস সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জি পরমেশ্বর বলেন, সরকারের কোনো উদ্দেশ্যই কাউকে আড়াল করা বা কাউকে হেয় করা নয়। তার ভাষ্য, ‘সত্যটা প্রকাশিত হওয়া উচিত। কিছু না পাওয়া গেলে ধর্মস্থলের মর্যাদা আরও বাড়বে। আর যদি কিছু প্রমাণিত হয়, তবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।’
উল্লেখ্য, জুলাইয়ের শুরুর দিকে মধ্যবয়সী ব্যক্তিটি পুলিশের কাছে শত শত নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা সংশ্লিষ্ট একটি অভিযোগ দায়ের করেন। এরপর তার বক্তব্য রেকর্ড করার জন্য তাকে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়। তার পরিচয় এখনও গোপন রাখা হয়েছে। এরপর থেকে তার চেহারাও গোপন রাখা হয়েছে। তাকে সম্পূর্ণ কালো পোশাক পরিয়ে জনসমক্ষে হাজির করা হয়- যার মধ্যে একটি হুড এবং একটি মুখোশও রয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব