রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক : উইকিপিডিয়ার সহ-প্রতিষ্ঠাতা জিমি ওয়েলস বলেছেন, ‘মুহাম্মদ ইউনূস শুধু নোবেলজয়ী নন, ব্যক্তিগতভাবে উনি অত্যন্ত আনন্দময় ও সদয় একজন মানুষ। আমি তাকে খুব কাছ থেকে চিনি এবং তিনি আমাকে বরাবরই অনুপ্রাণিত করেছেন’।
কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে উইকিপিডিয়ার সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশি এক গণমাধ্যমের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এভাবেই বলছিলেন উইকিপিডিয়ার সহ-প্রতিষ্ঠাতা জিমি ওয়েলস। এসময় তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইউনূস যেভাবে টানাপড়েনের মধ্যে আছেন, তা দুঃখজনক হলেও তিনি আশাবাদী যে ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আরও শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল ভবিষ্যতের দিকে এগোবে।
সাক্ষাৎকারে তিনি স্মরণ করেন বিগত সময়ে নিজের সংক্ষিপ্ত ঢাকা সফরের কথা, যেখানে ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মাঝে ঢাকার কয়েকজন উইকিপিডিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। জিমি ওয়েলস জানান, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস তাকে আমন্ত্রণ করেছেন, তাই সম্ভব হলে আগামী গ্রীষ্মে পরিবারসহ তিনি আবারও বাংলাদেশে আসতে চান।
বন্ধুত্বপূর্ণ এই প্রসঙ্গ ছাড়াও তিনি বাংলা উইকিপিডিয়া সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য বিকাশ, এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নবীন উইকিপিডিয়া সম্পাদকদের জন্য উৎসাহমূলক দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন। এছাড়াও বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং তথ্যবিকৃতির যুগে উইকিপিডিয়ানদের নিরপেক্ষ ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দেন ওয়েলস।
প্রথম প্রশ্ন
আন্দোলনের অগ্রগতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
জিমি ওয়েলস
আমি এখন কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত উইকিম্যানিয়ায় আছি, এবং এখানকার প্রাণোচ্ছল বাংলা উইকিপিডিয়ানদের দেখা পেয়ে দারুণ লাগছে। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ, আপনারা দারুণ দারুণ টি-শার্ট পরেছেন! দেখেন, আমি একজনকে টেনে আনছি...। এই যে দারুণ টি-শার্টগুলো! দারুণ মজা করছি আমরা এখানে। সবাই ব্যস্ত থাকে, প্রচুর সম্পাদনা করে।
বিশ্বের নানা প্রান্তে, বড় ভাষা থেকে শুরু করে খুব ছোট ভাষার মানুষরাও উইকিপিডিয়া সম্পাদনা করছে। বাংলার মতো ভাষা হয়তো মাঝামাঝি ধরনের — ভাষাভাষীর সংখ্যা অনেক, তবে উইকিপিডিয়া হিসেবে এখনও তুলনামূলক ছোট। কিন্তু খুব দ্রুত বাড়ছে, এটা দারুণ আশাব্যঞ্জক।
আমার আশা, যদি উইকিপিডিয়ার এখন প্রায় ২৫ বছর হয়ে থাকে, তাহলে আগামী ২৫ বছরের মধ্যে আমরা আমাদের সেই স্বপ্ন—প্রতিটি মানুষকে তার নিজের ভাষায় একটি মুক্ত বিশ্বকোষ দেওয়ার—পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে পারব।
দ্বিতীয় প্রশ্ন
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উইকিপিডিয়ানদের জন্য আপনি কী পরামর্শ দেবেন, যারা নতুনভাবে যুক্ত হচ্ছেন ও সম্প্রদায় গড়ে তুলছেন?
জিমি ওয়েলস
যে পরামর্শটা আমি সবসময় দিয়ে থাকি, তা হলো—নতুনদের দিকে মনোযোগ দিন। অনেকেই একবার উইকিতে এডিট করে চলে যায়, বা দু-একবার ফিরে আসে। তাদের স্বাগত জানান, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করান। যদি কেউ একটা ছোট সম্পাদনা করে, তাহলে আপনি গিয়ে তার আলাপ পাতায় লিখুন, ‘আপনার সম্পাদনার জন্য ধন্যবাদ! খুব ভালো লাগলো। আপনি অমুক বিষয়ে লিখেছেন, আপনি কি অমুক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত? তিনি এই বিষয়ে অনেক জানেন।
আপনি হয়তো জানেন না তারা কোন দিকে আগ্রহী, কিন্তু এমন আন্তরিক বার্তা পেলে মানুষ উইকিপিডিয়াকে অনেক মানবিকভাবে অনুভব করে।
তৃতীয় প্রশ্ন
আপনি একবার বাংলাদেশে এসেছিলেন, আর ড. মুহাম্মদ ইউনূস আপনার বন্ধু হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের জন্য কিছু স্মৃতি বা ভাবনা শেয়ার করবেন?
জিমি ওয়েলস
হ্যাঁ, ইউনূস সাহেবের কথা বললে অনেক কথা মনে পড়ে। উনি শুধু নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নন, ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত ও দয়ালু মানুষ। উনি আমাকে বহুবার অনুপ্রাণিত করেছেন। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাকে কিছুটা টেনে আনা হয়েছে, তবে আমি আশাবাদী—উনি বাংলাদেশকে আরও উঁচু স্তরে নিয়ে যেতে পারবেন। আমি বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে মত দিতে চাই না, শুধু বলতে চাই, শান্তিপূর্ণভাবে চিন্তাশীল মানুষ একসাথে কাজ করুক, সেটাই চাই। ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার আশা অনেক।
আমি মনে করি, দ্বন্দ্ব নিরসনের পথে আমাদের সবারই শেখার আছে। আজকের ভুল তথ্য, অপপ্রচার আর রাজনৈতিক মেরুকরণের যুগে উইকিপিডিয়ানদের একটা বিশেষ ভূমিকা আছে। আমরা তো শুধু তথ্য নিয়ে কাজ করি, নিরপেক্ষ থাকি। এটা সাংবাদিকদের জন্যও একটা অনুপ্রেরণা হতে পারে—যারা এ বিষয়ে আরও ভালো জানার কথা।
আমি যখন বাংলাদেশে এসেছিলাম, একদিক থেকে খুব কষ্টের সফর ছিল। কারণ আমার থাকার সময় ছিল একেবারেই কম ২৪ ঘণ্টারও কম! খুব তাড়াহুড়ো করে এলাম, কয়েকজন উইকিপিডিয়ানকে দেখলাম, তারপর ফেরত যেতে হলো। আমি খুবই ইচ্ছুক আবার আসতে। ইউনূস সাহেব আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। হয়তো আগামী গ্রীষ্মে পরিবারসহ আসার চেষ্টা করব, এখনো নিশ্চিত না, তবে ইচ্ছা আছে।
চতুর্থ প্রশ্ন
বাংলা উইকিপিডিয়া সম্প্রদায়ের টেকসই উন্নয়ন ও বৈশ্বিক সংযুক্তির জন্য আপনি কী পরামর্শ দেবেন?
জিমি ওয়েলস
চ্যাপ্টার হিসেবে কাজ করতে গিয়ে অনেক কিছুই করা যায়—নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও এই আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করা যায়, বিশেষ করে মিডিয়ার সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে। ওরা প্রায়ই ভুলভাবে আমাদের ব্যাখ্যা করে, তাই যতটা সম্ভব ওদের বোঝানো দরকার—আমরা ফেসবুক বা টিকটক না, আমরা অন্যরকম চিন্তাশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, গ্যালারি, গ্রন্থাগার, আর্কাইভ, জাদুঘর, বিশ্ববিদ্যালয়—এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব তৈরি করা। কারণ সাধারণ উইকিপিডিয়ানদের কেউ সহজে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে পারে না। আবার কখনো কখনো কেউ করেন, সেটা দারুণ ব্যাপার। কিন্তু চ্যাপ্টার থাকলে এসব অংশীদারিত্ব অনেক সহজ হয়।
এই কারণে চ্যাপ্টার থাকা এত গুরুত্বপূর্ণ, এর মাধ্যমে উইকিপিডিয়া আরও দৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড়াতে পারে।
রিপোর্টার্স২৪/সোহাগ