| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

মার্কিন ৫০% শুল্কে বিপর্যস্ত ভারতীয় রপ্তানি, ঝুঁকিতে লক্ষাধিক চাকরি

reporter
  • আপডেট টাইম: অগাস্ট ২৬, ২০২৫ ইং | ১৪:২৯:২৮:অপরাহ্ন  |  ১৫৮৩৫৯৯ বার পঠিত
মার্কিন ৫০% শুল্কে বিপর্যস্ত ভারতীয় রপ্তানি, ঝুঁকিতে লক্ষাধিক চাকরি

আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বুধবার থেকে ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করায় ভারতের রপ্তানি খাত এক গভীর সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরী হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন-মুনাফা ও শ্রমনির্ভর খাত—যেমন পোশাক, টেক্সটাইল, রত্ন ও গয়না, সামুদ্রিক চিংড়ি, কার্পেট, হস্তশিল্প ও আসবাব—মার্কিন বাজারে কার্যত অপ্রতিযোগিতামূলক হয়ে পড়তে যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে নিম্ন-কুশল শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে। বিপরীতে, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, এমনকি চীন ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো, যারা ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে তুলনামূলকভাবে কম শুল্ক সুবিধা পাচ্ছে, ভারতের এই বাজার-ক্ষতি থেকে লাভ তুলতে পারে।

গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (জিটিআরআই)-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (এফওয়াই২৬) মার্কিন বাজারে ভারতের পণ্য রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৪৩ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে (এফওয়াই২৫) যেখানে রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ বিলিয়ন ডলার, সেখানে এফওয়াই২৬-এ তা নেমে আসতে পারে মাত্র ৪৯.৬ বিলিয়ন ডলারে। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের মোট রপ্তানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পণ্য এখন ৫০ শতাংশ শুল্কের আওতায় পড়বে, যা কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর শুল্ক হার কে  ৬০ শতাংশের ওপরে নিয়ে যাবে। 

যদিও প্রায় ৩০ শতাংশ রপ্তানি, মূলত ওষুধ, ইলেকট্রনিক্স ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য—মূল্যমান প্রায় ২৭.৬ বিলিয়ন ডলার—এই শুল্ক থেকে অব্যাহতি পেয়েছে, তবু বাকি অংশের ওপর চাপ মারাত্মক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জুলাইয়ের শেষদিকে ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করেন এবং আগস্টের শুরুতে আরও ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেন, যেটিকে তিনি “রাশিয়ান তেল ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার শাস্তি” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। 

এই অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভারতের মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতা ক্ষমতা ভেঙে পড়েছে। বিশেষত এমন সময়ে এই ধাক্কা এল যখন ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদারের মধ্যে অন্যতম, যেখানে ভারতের একটি পণ্যের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে, যদিও চীন, রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ভারতের পণ্যের বাণিজ্য ঘাটতি স্পষ্ট।ভারতের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, যা ভারতের জিডিপির প্রায় ২ শতাংশের সমান। ফলে এই শুল্ক আরোপ সরাসরি জাতীয় আয়ের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। 

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই ধাক্কা মূলত অদক্ষ ও অর্ধ-কুশল শ্রমিকদের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। টেক্সটাইল, রত্ন ও গয়না খাতের সংগঠনগুলো কোভিড-১৯ সময়কার আর্থিক সহায়তার মতো প্রণোদনা দাবি করেছে যাতে ব্যাপক বেকারত্ব ঠেকানো যায়।যেসব খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে পোশাক, টেক্সটাইল, রত্ন ও গয়না, সামুদ্রিক চিংড়ি, যন্ত্রপাতি, ধাতু (ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, তামা), কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, চামড়া ও জুতো, হস্তশিল্প, আসবাবপত্র ও কার্পেট। 

হীরক পালিশ, সামুদ্রিক রপ্তানি ও হোম টেক্সটাইল খাত বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সামুদ্রিক রপ্তানির ক্ষেত্রে মার্কিন বাজারে ভারতের অংশীদারিত্ব প্রায় ৪৮ শতাংশ, ফলে এই খাতের উৎপাদন ও বিক্রি দুটোই কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। হোম টেক্সটাইল ও কার্পেট খাতেও বড় ধাক্কা আসবে, কারণ এ খাতে যথাক্রমে ৬০ ও ৫০ শতাংশ রপ্তানি যায় মার্কিন বাজারে। ক্রিসিল রেটিংসের মতে, শুধু শুল্ক নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চাহিদার কাঠামোগত পরিবর্তন এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা এই খাতগুলোর আয় আরও কমিয়ে দেবে।

অর্থনীতিবিদ ও নোবেলজয়ী পল ক্রুগম্যান তাঁর ৮ আগস্টের বিশ্লেষণে বলেছেন, মার্কিন অর্থনীতির মৌলিক তথ্য ক্রমশ স্থবির মুদ্রাস্ফীতির দিকে ইঙ্গিত করছে, এবং প্রায় সব অর্থনীতিবিদরা একমত যে শুল্কনীতি মুদ্রাস্ফীতিমূলক। তিনি ইঙ্গিত করেছেন, একমাত্র যারা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত, তারাই ভিন্নমত পোষণ করছেন।

এমন পরিস্থিতিতে রপ্তানিকারকেরা সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট সহায়তার দাবি জানাচ্ছেন। রত্ন ও গয়না খাতের সংগঠন জেম অ্যান্ড জুয়েলারি এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিল (জিজিইপিসি) বলেছে, ৫০ শতাংশ শুল্ক তাদের রপ্তানি কার্যত অকার্যকর করে তুলবে, যা শুধু রপ্তানি নয়, দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন শৃঙ্খলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই খাতে মার্কিন বাজারের অংশীদারিত্ব ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা মোট বৈদেশিক রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ। 

রপ্তানিকারকেরা প্রস্তাব করেছেন, আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ হয়েছে, তার অন্তত ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ শুল্ক ফেরত বা রেয়াত দেওয়া হোক।শ্রমনির্ভর টেক্সটাইল খাতও জরুরি নগদ সহায়তা ও ঋণ পরিশোধে ছাড় চেয়েছে। তারা একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে মার্কিন বাজারের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া যায়।যদিও ফার্মাসিউটিক্যালস, ইলেকট্রনিক্স ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের মতো কিছু রপ্তানি আপাতত শুল্কমুক্ত থাকছে, ট্রাম্প প্রশাসন এই খাতগুলোতেও ভবিষ্যতে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে। 

ওষুধ প্রস্তুতকারকদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, তারা যদি আগামী দুই বছরের মধ্যে উৎপাদন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর না করে, তাহলে শুল্ক ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। ইলেকট্রনিক্স খাতেও একই হুমকি দেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে অ্যাপল-সহ অন্যান্য বড় কোম্পানিগুলোকে।ভারতের রপ্তানির এই অনিশ্চয়তা শুধু পণ্য খাতে নয়, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক আয় এবং আর্থিক ভারসাম্যে এক দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা দিতে চলেছে। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত আর্থিক প্রণোদনা, বাজার বৈচিত্র্যকরণ ও নতুন বাণিজ্য চুক্তির পথে না এগোলে, এই সংকট ভারতের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলতে পারে।


রিপোর্টার্স২৪/এসএন

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪