আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি :
গুজরাটের গির সোমনাথ জেলার বেরাভালে পির সিলার শাহ দরগাহর ১২তম প্রজন্মের তত্ত্বাবধায়ক জাভেদ হুসাইন বানভা সম্প্রতি আংশিকভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন — চিকিৎসকরা বলছেন, উদ্বেগ এবং মানসিক আঘাতই এর কারণ। পরিবারের কোনো জিনগত ইতিহাস না থাকা সত্ত্বেও এই ধাক্কা তার জীবনে এসেছে ২০২৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর, যেদিন সকালে পুলিশি ঘেরাটোপে ধ্বংস করা হয় পির সিলার শাহ দরগাহ সহ মুসলিমদের সঙ্গে যুক্ত আরও আটটি ধর্মীয় কাঠামো।
“আমাদের সাধু, আমাদের সুফির মাজার ভেঙে ফেলার পর আমার কাছে কিছুই আর বোধগম্য মনে হয়নি,” বলেন বানভা, যিনি শৈশব থেকেই মাজারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখন তার স্মৃতির সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গেছে তার পরিবার, ইতিহাস, এবং একটি গোটা সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক চিহ্ন।
সেদিন ভোরে, প্রায় ১,৪০০ পুলিশ, ৬০টি খননযন্ত্র, ৫০টি ট্র্যাক্টর-ট্রেলার, এবং হাইড্রোলিক ক্রেন নিয়ে অভিযান চালিয়ে ভেঙে ফেলা হয় মাজার, মসজিদ ও মুসলিম মালিকানাধীন ৪৭টি বাড়ি। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই অভিযান চালানো হয়। প্রায় ২০০ জন বাসিন্দা ক্ষতিগ্রস্ত হন, এবং অন্তত ১৫০ জনকে আটক করা হয়।
এই ‘অপবিত্রতা’র বিরুদ্ধে লড়াই করছেন বেরাভালের বাসিন্দা ইসমাইলভাই ছেল, যিনি আউলিয়া-ই-দীন কমিটির সভাপতি। কমিটি ৩ অক্টোবর, ২০২৪ তারিখের গুজরাট হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে বিশেষ আবেদন দাখিল করেছে। সিনিয়র অ্যাডভোকেট কপিল সিবাল আদালতে বলেন, “যদি মাজার ১৯০৩ সালের হয়, তাহলে এটিকে অবৈধ বলা যায় কীভাবে?”
তিনি আরও দাবি করেন, এই জমিগুলো ওয়াকফ বোর্ডের অধীনে ছিল, এবং সরকার মালিকানা নির্ধারণ ছাড়াই এগিয়ে গিয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারিত হয়েছে ১৫ জুলাই, ২০২৫।৬০ বছর বয়সী খাতুনা আব্দুল কাদির, যিনি হাজী মঙ্গরোলি শাহ দরগাহর নিয়মিত দর্শনার্থী ছিলেন, বলেন, “তারা আমাদের মাজার, মসজিদ আর বাড়িঘর একসঙ্গে ধ্বংস করেছে। আমি শুধু ভাবি, কেন তারা আমাদেরও পিষে ফেলেনি?” তিনি ২০২৪ সালে উরসে অংশ নিতে পারেননি। তার মতে, এই অপমান মৃত্যুর থেকেও যন্ত্রণাদায়ক।
তার প্রতিবেশী সাফিনা বানোর অভিজ্ঞতা আরও নির্মম। বুলডোজারের হুমকিতে তিন মাসের শিশুকে বুকে নিয়ে তাঁকে বের করে দেওয়া হয়। “আমার সন্তানের জন্য খাবার নেওয়ার সময়ও দেওয়া হয়নি,” বলেন বানো। “আমাদের জীবন যেন আর কোনো অর্থ বহন করে না।”
ধ্বংস করা মাজারগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি — যেমন পির সিলার শাহ, মায়াপুরী এবং হাজি মঙ্গরোল দরগাহ — ১৯৬০-এর দশকে গুজরাট ওয়াকফ বোর্ডের অধীনে নিবন্ধিত ছিল। কিন্তু গুজরাট প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর দাবি করেছে, সংস্কারের কারণে এগুলো ‘নতুন নির্মাণ’ হয়ে গেছে এবং ঐতিহাসিক মর্যাদা হারিয়েছে। একই সময়ে, হিন্দু মন্দিরগুলোর ক্ষয়িষ্ণু অংশ সংস্কারের জন্য আহ্বান জানিয়েছে অধিদপ্তর।
লেখমালা নিউজের সম্পাদক মীর খান মাকরানি একটি আরটিআই দাখিল করে এই ধ্বংসকাণ্ডের পেছনের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার দাবি, অধিদপ্তরের জবাবগুলোতে পরিষ্কারভাবে হিন্দু ধর্মীয় স্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইসা পটেল বলেন, “তারা চায় না মুসলিমরা এই পবিত্র জেলায় থাকুক। আইন যেন শুধু আমাদের বিরুদ্ধেই প্রয়োগ হয়।” গির সোমনাথে একাধিক বার এমন ধ্বংসকাণ্ড চালানো হয়েছে, এমনকি সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশ অমান্য করেও। ২০২৫ সালের মার্চে, জুনাগড়ে আরেকটি মাজার রাতের অন্ধকারে পুলিশি পাহারায় ধ্বংস করা হয়।
বানভা এখন একটি ঘোলাটে জগতে বসবাস করেন — যেখানে চোখে কিছুই স্পষ্ট দেখা যায় না, যেমন তার সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ। “আমার চোখের আলো চলে গেছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আমি হারিয়েছি বিশ্বাস, আশ্রয়, আর পরিচয়,” বলেন তিনি।
আজকের গির সোমনাথ শুধুমাত্র একটি ভাঙা দরগাহর ধ্বংসস্তূপ নয়, এটি ভারতের সংবিধান, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং বিচারব্যবস্থার একটি পরীক্ষাক্ষেত্র — যেখানে হাজারো মুসলিম এখনও প্রতিদিন প্রার্থনা করছেন, যেন তারা শুধু দেখতে না পান, বরং বেঁচে থাকতে পারেন।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব