| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থায় পদত্যাগের হিড়িক কেন?

reporter
  • আপডেট টাইম: Jul ২০, ২০২৬ ইং | ০৬:০৭:৩১:পূর্বাহ্ন  |  ৭০৬৭ বার পঠিত
ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থায় পদত্যাগের হিড়িক কেন?

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোয় পদত্যাগের হিড়িক শুরু হয়েছে। গত কয়েক দিনে ইসরো থেকে শতাধিক বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ একসঙ্গে পদত্যাগ করেছেন। এর ফলে ভারতের মহাকাশ গবেষণা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছে। পদত্যাগকারীদের মধ্যে রয়েছেন একাধিক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, যারা গুরুত্বপূর্ণ মিশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

• কেন এই সংকট?

ভারতের মহাকাশ গবেষণা গত দুই দশকে এমন কর্মীসংকটে কখনো পড়েনি। কেন্দ্রীয় সরকারের মহাকাশ বিষয়ক দপ্তরের হিসেব অনুযায়ী, গবেষণার জন্য ২০ হাজারের বেশি পদ বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু এখন ১৫ হাজারও কর্মী নেই। সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি পদ খালি। অর্থাৎ এক-চতুর্থাংশের বেশি পদ ফাঁকা পড়ে রয়েছে। অতীতেও পদের তুলনায় কম সংখ্যক কর্মী যুক্ত ছিলেন মহাকাশ গবেষণায়। তবে এখনকার মতো পরিস্থিতি গত বছর ছাড়া আর কখনো হয়নি।

চাকরি ছাড়ার তালিকায় অন্যতম বড় নাম ছিল ভিএসএসসির লঞ্চ ভেহিকল মার্ক-৩ প্রকল্পের তৎকালীন পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ভিক্টর জোসেফ টি। এই রকেটটিই গগনযান মিশনে ব্যবহার করা হবে, অথচ প্রকল্পের প্রধান হিসেবে ১৩ মাস দায়িত্ব পালনের পরে ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি পদত্যাগ করেন।

ইসরোতে গণ-পদত্যাগের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ এর অন্যতম কারণ। ২০২০ সালে মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রকে বেসরকারি সংস্থার জন্য খুলে দেওয়ার পর থেকে গড়ে উঠেছে এই বিষয়ক স্টার্টআপ। ২০১৪ সালে মাত্র একটি মহাকাশ স্টার্টআপ ছিল, ২০২৫ সালের মধ্যে তার সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে। এসব সংস্থা উপগ্রহ প্রযুক্তি, প্রপালশন ব্যবস্থা, ইমেজিং ও গবেষণার অন্য ক্ষেত্রে কাজ করছে।

স্কাইরুট অ্যারোস্পেস, অগ্নিকুল কসমস, বেলাট্রিক্স অ্যারোস্পেস, ধ্রুব স্পেসের মতো কোম্পানিতে ইতোমধ্যে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৫ সালেই এসেছে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার। এর ফলে সংস্থাগুলো আকর্ষণীয় বেতনের প্রস্তাব দিতে পারছে।

ইসরোতে কাজ শুরু করা বিজ্ঞানীর বার্ষিক প্রাপ্তি আনুমানিক ১০-১২ লাখ টাকা। ২০ বছরের বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীর সর্বোচ্চ বেতন বছরে ২৫ লাখের মতো। খোদ ইসরোর চেয়ারম্যানের বার্ষিক বেতন প্রায় ৩০ লাখ টাকা। এর তুলনায় বেসরকারি স্টার্টআপে অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের অনেক বেশি বেতন লাভের সুযোগ রয়েছে।

ইসরোর সাবেক চেয়ারম্যান সি মাধবন নায়ার বলেন, সরকারি নীতির ফলে এই সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বেসরকারি সংস্থা মহাকাশ শিল্পে উঠে আসছে এই নীতিকে কাজে লাগিয়ে, তারা চার-পাঁচগুণ বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। এতে ছাত্রছাত্রীরা আকৃষ্ট হতেই পারেন। যদিও এভাবে সুবিধা দেয়া অনৈতিক বলে আমি মনে করি।

• অভ্যন্তরীণ সমস্যা কতটা?

শুধু বেতনের আকর্ষণই নয়, ইসরোর অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যাও গণ-পদত্যাগের জন্য দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। প্রশাসনিক জটিলতা, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে অনিশ্চয়তা অনেক বিজ্ঞানীর মধ্যে ইসরো সম্পর্কে মোহভঙ্গ ঘটিয়েছে। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, কাজে স্বীকৃতির অভাবও ক্ষুণ্ণ করেছে তাদের। গগনযান, এসএসএলভি-এল১, জিএসএলভি-এফ১৭-এর মতো একাধিক মিশনের সময়সীমা বারবার পিছিয়ে যাওয়ায় বিজ্ঞানীদের মধ্যে হতাশাও তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক অতীতে ইসরোর একাধিক বড় মিশন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং সফল রকেট হিসেবে পরিচিত পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল এক বছরের মধ্যে পর পর দুটি ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছে। গত বছরের মে ও এ বছরের জানুয়ারিতে দুটি রকেটের মিশন ব্যর্থ হয়।

এই পরিস্থিতিতে বিকল্প প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছেন বিজ্ঞানীরা। শিশির রাডারের প্রতিষ্ঠাতা, ইসরোর সাবেক বিজ্ঞানী তপন মিশ্র বলেন, স্টার্টআপের কর্মী দরকার। সেই কর্মীর উৎস হচ্ছে ইসরো। এখনকার তরুণরা ঝুঁকি নিতে ভালোবাসেন। তারা সরকারি চাকরির নিরাপত্তার তুলনায় চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করেন। গত এক বছরে একের পর এক লঞ্চের ব্যর্থতায় সামগ্রিক মনোবল কমে গিয়েছে, হতাশা গ্রাস করেছে। ১৮ হাজার কর্মীর মধ্যে ১০০ জনের পদত্যাগ বড় বিষয় নয়। কিন্তু এটা হিমশৈলের চুড়ো মাত্র। এখনই সমস্যার সমাধান করা না গেলে এটা অসুখের চেহারা নেবে।

• পদত্যাগ ঠেকানোর নির্দেশ

পদত্যাগের প্রবণতা আরও বাড়লে সরকারি মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, এই আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বের চতুর্থ দেশ হিসেবে মহাকাশে মানুষ পাঠানোর গৌরব এনে দেওয়ার গগনযান মিশন, চাঁদের মাটি ফিরিয়ে আনার অভিযান চন্দ্রযান-৪-এর প্রস্তুতি পর্বে রয়েছে দেশ। এছাড়া নিজস্ব মহাকাশ কেন্দ্র ভারতীয় অন্তরীক্ষ স্টেশন ও মঙ্গল গ্রহ অভিযানের দ্বিতীয় ধাপ মঙ্গলযান-২ ইসরোর কর্মসূচিতে রয়েছে। এই সংস্থাকে ভবিষ্যতে সাফল্যের পথে কারা নিয়ে যাবেন, এই প্রশ্ন উঠেছে।

পদত্যাগের ঢেউকে থামাতে মহাকাশ দপ্তর ১৪ জুলাই একটি নির্দেশিকা জারি করে। বেঙ্গালুরুর ইউআর রাও স্যাটেলাইট সেন্টার ও তিরুবনন্তপুরমের বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার-সহ ইসরোর প্রধান গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে এই নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। নির্দেশিকার বলা হয়েছে, গগনযান ও অন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কর্মরত গ্রুপে বিজ্ঞানী ও কারিগরি কর্তাদের স্বেচ্ছাবসর বা পদত্যাগের আবেদন অতীতের মতো রুটিনমাফিক গ্রহণ করা হবে না।

এই কড়া নির্দেশিকায় কী কাজ হবে? সি মাধবন নায়ারের বক্তব্য, আমি যখন চেয়ারম্যান ছিলাম, তখন বিশেষভাবে সফল কোনো কর্মীকে ইনসেনটিভ দেয়ার ব্যবস্থা ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নগদ পুরস্কারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। এই ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। নইলে শুধু সরকারি নিয়ম তৈরি করে একটি সংস্থায় কোনো কর্মীকে বেঁধে রাখা যাবে না।

তপন মিশ্রের মতে, বেতন একটা ব্যাপার বটে। তবে ইসরোর জন্য কাজ করার যে অহমিকা বোধ ছিল, সেটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ১০০ জন চলে যাওয়া বড় বিষয় নয়। কিন্তু ইসরোর কর্মীরা তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করার অহমিকা, গৌরব হারিয়ে ফেলছেন, এটা চিন্তার। এই বিষয়টাকে সামলাতে হবে কর্তৃপক্ষকে। এটাকে কয়েকটা নির্দেশ জারি করে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

• স্টার্টআপের সাফল্য

ইসরো নিয়ে জল্পনার মধ্যে প্রথম বড় মাপের সাফল্য পেয়েছে মহাকাশ গবেষণায় যুক্ত একটি বেসরকারি স্টার্টআপ সংস্থা। শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার এই ইতিহাসের সাক্ষী থেকেছে। স্কাইরুট এরোস্পেসের উদ্যোগে তৈরি রকেট বিক্রম-১-এর উৎক্ষেপণ করা হয়েছে শনিবার। এটা বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি ভারতের প্রথম রকেট উৎক্ষেপণের নজির।

ভারতের আগে আর মাত্র দুটি দেশের কোনও বেসরকারি সংস্থা এই সাফল্য পেয়েছে। হায়দরাবাদের স্টার্টআপ স্কাইরুটের প্রতিষ্ঠাতা দুই বিজ্ঞানী পবনকুমার চন্দনা ও নাগাভারত ডাকা ইসরোর সাবেক বিজ্ঞানী। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাফল্য ভারতের মহাকাশ গবেষণায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার জয়যাত্রায় মাইলফলক হয়ে রইল।

ইসরোর সাবেক বিজ্ঞানী ও কর্মীরা নবগঠিত বিভিন্ন স্টার্টআপে বিশেষজ্ঞ হিসেবে যোগ দিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানের সাবেক চেয়ারম্যান এস সোমনাথ গত বৃহস্পতিবার চেন্নাইয়ের সংস্থা অগ্নিকুল কসমসের বোর্ড অফ ডিরেক্টর্সে যোগ দিয়েছেন। চন্দ্রযান-৩-সহ ভারতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ অভিযান প্রকল্পে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও মহাকাশ বিশেষজ্ঞ দেবীপ্রসাদ দুয়ারী এই বোঝাপড়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে ভারত সরকার স্টার্টআপের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মহাকাশ বিজ্ঞানের গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছে। এটা ভালো ভাবনা। তবে এই সিদ্ধান্তে গবেষণার ক্ষেত্রে কতটা ভালো হবে, তা এই মুহূর্তেই বলা যাচ্ছে না। স্টার্টআর কোম্পানির মাধ্যমে শনিবারই একটি সফল উৎক্ষেপণ হয়েছে। মহাকাশ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ভারতের যে সামগ্রিক প্রয়াস, তাতে এই উদ্যোগ কাজে আসবে বলে মনে হয়। ডিডাব্লিউ।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪