রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: দেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, দুদকের হারানো ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা এবং দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হবে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) দুদকের প্রধান কার্যালয়ে নতুন কমিশনের প্রথম কার্যদিবসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় দুদকের দুই কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন, আমরা যেন মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশের জন্য কাজ করতে পারি; দুদকের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে পারি এবং দেশ দুর্নীতিমুক্ত করতে যথেষ্ট চেষ্টা চালাতে পারি। ইনশাআল্লাহ আগামী দিনে ভালো ফল আনব।
দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা অন্য কোনো চাপের মুখে পড়বে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান বলেন, তারা কোনো চাপের মধ্যে নেই।
তিনি বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, আমরা কোনো চাপের মধ্যে নেই। আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করছি। আমাদের সামনে কোনো সমস্যা এলে তা সমাধান করার চেষ্টা করব। মানুষের প্রত্যাশাকে সামনে রেখেই আমরা এখানে এসেছি।’
নতুন কমিশনের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই সব বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে চান না বলেও সাংবাদিকদের উদ্দেশে মন্তব্য করেন দুদক চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিনেই যদি আপনারা সব শুনে নেন, তাহলে বাকি দিন কী করবেন? দীর্ঘদিন আপনাদের সঙ্গে কাজ করব।’
তার এই বক্তব্যে দীর্ঘমেয়াদে দুদকের কার্যক্রমে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার প্রত্যাশার কথাই উঠে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন কমিশনের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে দুদক নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে বলে আশ্বস্ত করেছেন কমিশনার ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ বিচারক এই কমিশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন। তার নেতৃত্বে প্রতিটি বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আশা করি, আপনারা অতি অল্প সময়ের মধ্যে এসব বিষয়ে অগ্রগতি জানতে পারবেন।’
বুধবার নতুন দুদক চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান এবং দুই কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া প্রথমবারের মতো কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন।
সকাল ৯টার দিকে তারা দুদকের প্রধান কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। পরে সকাল ১০টায় পূর্বনির্ধারিত মতবিনিময় সভায় অংশ নেন নতুন কমিশনের সদস্যরা।
সভায় দুদক সচিব সাইদুর রহমান, মহাপরিচালকসহ উপপরিচালক পর্যায় পর্যন্ত কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। সভায় নতুন কমিশনের সঙ্গে সংস্থার কর্মকর্তাদের পরিচয় ও বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে মতবিনিময় হয়।
এর আগে ১৮ আগস্ট দুপুর ২টায় নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে যোগদান করেন বলে জানিয়েছেন দুদক সচিব সাইদুর রহমান।
গত সোমবার সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানকে দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। একই প্রজ্ঞাপনে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়াকে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির স্বাক্ষর করা প্রজ্ঞাপনে নতুন কমিশনের তিন সদস্যের নিয়োগের বিষয়টি জানানো হয়।
বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। তিনি দীর্ঘদিন হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর আপিল বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ থেকে অবসর নেন তিনি।
অন্যদিকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কর কমিশনার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
অপর কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান একজন অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সচিব। তিনি ১৯৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন বলে জানা গেছে।
গত ৩ মার্চ দুদকের চেয়ারম্যানসহ তিন কমিশনার পদত্যাগ করার পর নতুন কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেয় সরকার। নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সদস্যসচিব করে একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়।
সার্চ কমিটি ছয় দফা বৈঠক করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাই এবং তাদের যোগ্যতা পর্যালোচনা করে। পরে দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান এবং কমিশনার হিসেবে ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার নাম চূড়ান্ত করা হয়।
নতুন কমিশনের সামনে এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দুদকের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃশ্যমান ভূমিকা রাখা।
২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রথম চেয়ারম্যান বিচারপতি সুলতান হোসেন খান থেকে সর্বশেষ মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন পর্যন্ত মোট সাতটি কমিশন দায়িত্ব পালন করেছে।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনসহ নানা জটিলতার কারণে সাতটি কমিশনের মধ্যে মাত্র তিনটি কমিশন তাদের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পেরেছে। বাকি চারটি কমিশন মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই দায়িত্ব থেকে বিদায় নিয়েছে। সর্বশেষ মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশনও পূর্ণ মেয়াদ শেষ করার আগেই পদত্যাগ করে দায়িত্ব ছাড়ে।
এমন প্রেক্ষাপটে নতুন চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের কাছে মানুষের প্রত্যাশা এখন অনেক বেশি। স্বাধীনভাবে কাজ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, দুদকের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে নতুন কমিশনের অন্যতম প্রধান পরীক্ষা।
চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, জনগণের প্রত্যাশাকে সামনে রেখেই কাজ করতে চায় নতুন কমিশন। এখন তাদের কার্যক্রমে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন কতটা দেখা যায়, সেটিই দেখার বিষয়।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম