রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: শিক্ষা ক্যাডারদের নিয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির (ডিসিইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলামের বক্তব্যকে যথার্থ ও সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সিনেট সদস্য ড. কামরুল হাসান মামুন। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ‘সাহসী বক্তব্য’ দেওয়ার জন্য ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্যকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (২২ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন এসব কথা বলেন।
এর আগে শুক্রবার (২১ আগস্ট) এক মতবিনিময় সভায় ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলাম শিক্ষা ক্যাডারদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠদানের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সারা দেশে যারা পড়াচ্ছেন, তাদের মধ্যে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকরা রয়েছেন। তারা ইন্টারমিডিয়েট ও ডিগ্রি পর্যায়ে পড়ানোর পাশাপাশি অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়েও পাঠদান করছেন।
উপাচার্য আরও বলেন, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির আওতাভুক্ত সাত কলেজেও বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকরা রয়েছেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠদানের জন্য একজন শিক্ষকের যে চিন্তাভাবনা, গবেষণার মানসিকতা ও একাডেমিক প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সাত কলেজের শিক্ষা ক্যাডারদের কোন কাঠামোর মধ্যে রাখা হবে, তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন বলেও তিনি মত দেন।
উপাচার্যের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন তার পোস্টে বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এমন বক্তব্য দেওয়ার মতো উপাচারক খুব বেশি নেই। তার মতে, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম অন্তত বুঝতে পেরেছেন একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের যোগ্যতা ও মান কেমন হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, কোনো কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করলেই সেটি প্রকৃত অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যায় না। শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন কিংবা প্রশাসনিক কাঠামোর শীর্ষ পদে অধ্যক্ষের পরিবর্তে উপাচার্য নিয়োগ দিলেই একটি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয় না। বরং বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষকদের মান, গবেষণা, জ্ঞানচর্চা ও একাডেমিক পরিবেশের মাধ্যমে প্রকৃত পরিচয় তৈরি করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে অধ্যাপক কামরুল বলেন, ইংল্যান্ডে এমন অনেক কলেজ রয়েছে, যেগুলো বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ে শীর্ষ ১০-এর মধ্যে অবস্থান করে। একইভাবে ফ্রান্স ও ইতালিতেও এমন অনেক স্কুল রয়েছে, যেগুলো বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ের শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের নাম বা কাঠামোর চেয়ে শিক্ষকদের মান ও একাডেমিক সক্ষমতাই একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল শক্তি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশাসনিক ও একাডেমিক স্বাধীনতার বিষয়টিও তার পোস্টে তুলে ধরেন অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কখনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকতে পারেন না। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদবিতে ‘শিক্ষা ক্যাডার’ বা ‘শিক্ষা কর্মকর্তা’ ধরনের পরিচয় থাকা উচিত নয় বলেও মত দেন তিনি।
তার ভাষ্য, এ ধরনের প্রশাসনিক পরিচয় থাকলে একজন শিক্ষকের চিন্তা ও মানসিকতায় একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর প্রভাব তৈরি হতে পারে। মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র ও প্রশাসনিক নির্দেশনার মাধ্যমে তাদের কী করা যাবে, কী বলা যাবে—এসব বিষয় নিয়ন্ত্রিত হওয়ার সুযোগ থাকে। ফলে মুক্তভাবে চিন্তা ও গবেষণা করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে।
অধ্যাপক কামরুল আরও বলেন, কোনো শিক্ষক পিএইচডি অর্জন করার পরও নামের আগে ‘ড.’ ব্যবহারের জন্য যদি মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন হয়, তাহলে তার স্বাধীনভাবে চিন্তা করার পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তার মতে, মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারা এবং গবেষণা করতে পারাই একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের অন্যতম মৌলিক শর্ত।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মানেই জ্ঞানের পরিধি আকাশের মতো উন্মুক্ত এবং মহাসাগরের মতো গভীর হওয়া উচিত। গবেষণা, জ্ঞানচর্চা ও মুক্ত চিন্তার মাধ্যমে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে নিজেকে ক্রমাগত বিকশিত করতে হয়।
তবে শিক্ষা ক্যাডারদের সবাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে রাখার পক্ষে নন অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন। বরং যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের মধ্য থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ রাখার কথা বলেছেন তিনি।
তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষকের পিএইচডি থাকা বাঞ্ছনীয় ও কাঙ্ক্ষিত। একই সঙ্গে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি থাকলেই হবে না, সেই পিএইচডির মানও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি প্রস্তাব করেন, বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারদের মধ্যে যাদের মানসম্মত পিএইচডি রয়েছে, তাদের একটি নির্দিষ্ট ফিল্টারিং বা যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্যতা বিবেচনা করে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এতে তিনি কোনো সমস্যা দেখছেন না বলেও উল্লেখ করেন।
তবে তার মতে, কোনো শিক্ষা ক্যাডারকে একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলে তার সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের কোনো ধরনের অফিসিয়াল সংযুক্তি থাকা উচিত নয়। তখন তিনি আর কর্মকর্তা হিসেবে থাকবেন না; তার পরিচয় হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে।
অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুনের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে একদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের যোগ্যতা, গবেষণা ও একাডেমিক স্বাধীনতার বিষয়টি সামনে এসেছে, অন্যদিকে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠদানের কাঠামো ও যোগ্যতা নির্ধারণ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম