ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে আবারও পাকিস্তানি বিমান হামলার অভিযোগ উঠেছে। কুনার ও পাকতিকা প্রদেশে সোমবার মধ্যরাত ও ভোরে চালানো পৃথক হামলায় অন্তত তিন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার। সীমান্তে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি নিয়ে কাবুল ও ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যেই নতুন করে এই হামলা দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা আরও বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে।
আফগান বার্তাসংস্থা খ্যামা প্রেস জানিয়েছে, সোমবার রাত আড়াইটার দিকে কুনার প্রদেশের নুরগাল জেলায় পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান হামলা চালায়। পাটান গ্রামের একটি বাড়িকে লক্ষ্য করে চালানো ওই হামলায় তিন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন।
তালেবান কর্মকর্তাদের বরাতে হামলার এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তবে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
কুনারে হামলার প্রায় দেড় ঘণ্টা পর ভোর ৪টার দিকে পাকতিকা প্রদেশের বারমাল জেলায় দ্বিতীয় দফায় বিমান হামলা চালানো হয় বলে জানা গেছে।
তালেবান-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তোর কান্দি এলাকায় একটি পরিত্যক্ত দোকান এবং রাখায় একটি পরিত্যক্ত বাড়ি হামলায় ধ্বংস হয়েছে। তবে এসব ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে সাম্প্রতিক সময়ে প্রাণঘাতী হামলা বাড়ার পর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে পাকিস্তান। এর মধ্যেই আফগান ভূখণ্ডে নতুন করে বিমান হামলার ঘটনা ঘটল।
পাকিস্তানের অভিযোগ, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)—যাকে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ ‘ফিতনা আল-খাওয়ারিজ’ নামেও উল্লেখ করে—আফগানিস্তানের ভেতরে থাকা নিরাপদ আশ্রয় থেকে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।
তালেবান অবশ্য বারবার এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। কাবুলের অবস্থান হলো, আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশে হামলা চালানোর সুযোগ দেওয়া হয় না।
আফগানিস্তানে বিমান হামলার এক দিন আগে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, খাইবার পাখতুনখাওয়ার হাঙ্গু জেলায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষে দুই কর্মকর্তাসহ ছয় সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।
পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ কোহাটে সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলার সঙ্গেও আফগানিস্তান থেকে আসা সশস্ত্র ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছে। এসব ঘটনার পর সীমান্তপারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক চাপ আরও বাড়তে পারে বলে পরিস্থিতি থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই সীমান্ত নিরাপত্তা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে কাবুল ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে।
এর আগে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন প্রদেশেও পাকিস্তানি বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে। পাকিস্তানের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব হামলায় টিটিপি ও তাদের সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর ব্যবহৃত সশস্ত্র অবকাঠামো লক্ষ্য করা হয়েছে।
অন্যদিকে তালেবান কর্মকর্তারা এসব হামলার নিন্দা জানিয়ে এগুলোকে আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদের অভিযোগ, সশস্ত্র গোষ্ঠীর স্থাপনার পরিবর্তে এসব হামলায় বেসামরিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
পাকিস্তান অবশ্য নিজেদের ভূখণ্ডে হামলা চালানো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার থেকেই এমন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলে আসছে।
কুনার ও পাকতিকায় সর্বশেষ বিমান হামলার ঘটনা দুই দেশের মধ্যকার নিরাপত্তা বিরোধকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে পাকিস্তান সীমান্তপারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে, অন্যদিকে তালেবান আফগান ভূখণ্ডে সামরিক হামলাকে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।
ফলে সর্বশেষ হামলার পর কাবুল ও ইসলামাবাদের মধ্যকার টানাপোড়েন আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সীমান্তে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি, হামলার দায় এবং একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ—সব মিলিয়ে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/রাফিদ