| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ভারত ভাগের ৭০ বছর পর আসাম থেকে ঢাকার পথে প্রথম কার্গো জাহাজ

reporter
  • আপডেট টাইম: অক্টোবর ০৬, ২০২৬ ইং | ১০:৫০:৪০:পূর্বাহ্ন  |  ৫৩৮ বার পঠিত
ভারত ভাগের ৭০ বছর পর আসাম থেকে ঢাকার পথে প্রথম কার্গো জাহাজ

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: ভারত ভাগের প্রায় ৭০ বছর পর ভারতের আসাম রাজ্যের ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশের ঢাকার উদ্দেশে সরাসরি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। ঐতিহাসিক এই যাত্রায় ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে একটি কার্গো জাহাজ বাংলাদেশের পানগাঁও নৌবন্দরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে।

এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ বিরতির পর আসাম থেকে আন্তর্জাতিক নৌপথে সরাসরি পণ্য পরিবহনের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের যোগাযোগ আরও সহজ করতে এই নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার এক জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক এই নৌযাত্রার উদ্বোধন করেন ভারতের কেন্দ্রীয় বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথবিষয়ক মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনওয়াল। অনুষ্ঠানে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া রাজ্য সরকারের একাধিক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেড (এপিসিএল)-এর নামরূপ কারখানায় উৎপাদিত মিথানল এই প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে দীর্ঘ নৌপথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের ঢাকার পানগাঁও নৌবন্দরে পাঠানো হচ্ছে।

কার্গো জাহাজটি ব্রহ্মপুত্র নদের ‘জাতীয় জলপথ-২’ ব্যবহার করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করবে। এরপর ভারত-বাংলাদেশ প্রোটোকল রুট (আইবিপিআর) অনুসরণ করে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছাবে।

বগিবিল থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত পণ্যবাহী জাহাজটিকে মোট প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার নৌপথ পাড়ি দিতে হবে।

এই যাত্রাকে মূলত উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের যোগাযোগ স্থাপনে ব্রহ্মপুত্র নদ কতটা কার্যকর ও বাণিজ্যিকভাবে সম্ভাবনাময়, তা যাচাইয়ের একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সফল হলে ভবিষ্যতে আসামসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর পণ্য বাংলাদেশ হয়ে সমুদ্রবন্দর ও আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর পথ আরও সহজ হতে পারে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনওয়াল বলেন, তাঁর দাদা-দাদিরা ডিব্রুগড় ঘাটে স্টিমারের সিটি শুনে বড় হয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ ৭০ বছর সেই সিটি বন্ধ ছিল, বন্ধ হয়ে গিয়েছিল জাহাজ চলাচলও।

তিনি বলেন, আজ আবারও ডিব্রুগড় থেকে বিশ্বের উদ্দেশে জাহাজ যাত্রা করল। নদী আমাদের কখনোই প্রতারিত করেনি, অভাব ছিল শুধু এটি পুনরুজ্জীবিত করার রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির।

একসময় পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত নদীবন্দর হিসেবে পরিচিত ছিল ডিব্রুগড়। ১৮৫৬ সালের মধ্যেই তৎকালীন কলকাতা থেকে সরকারি স্টিমার নিয়মিতভাবে ডিব্রুগড়ে পৌঁছাত।

১৮৮২ সালে ডিব্রুগড় স্টিমার ঘাট থেকে চালু হয় ‘ডিব্রু-সাদিয়া রেলওয়ে’। এরপর নদীপথ ও রেলপথের সমন্বয়ে এই অঞ্চলটি পূর্ব ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়।

১৯১৩ সালের মধ্যে ডিব্রুগড় ঘাট দিয়ে প্রতিদিন চা, কাঠ ও যাত্রী পরিবহনকারী স্টিমার চলাচল করত। আসামের চা ও অন্যান্য পণ্য নদীপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এই নৌবন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের পর এই ঐতিহাসিক নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা বড় ধরনের ধাক্কা খায়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় আসামের পণ্য পরিবহনের পুরোনো নৌপথ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ফলে আসামের পণ্য কলকাতায় পৌঁছাতে নতুন ও দীর্ঘতর পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। ধীরে ধীরে নদীপথের গুরুত্ব কমতে থাকে।

এরপর ১৯৫০ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ডিব্রুগড় এলাকায় ব্রহ্মপুত্রের নদীতলদেশের বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। নদীর নাব্যতা ও নৌ চলাচলেও এর প্রভাব পড়ে।

একই সময়ে চা পরিবহন ক্রমে রেলপথে স্থানান্তরিত হওয়ায় ডিব্রুগড় ঘাটের ওপর নির্ভরতা আরও কমে যায়। ১৯৫৪ সালে ঘাট থেকে নিয়মিত বুকিং বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর ডিব্রুগড় ঘাট পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে নদীপথে বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। ১৯৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশ একটি নদী বাণিজ্য প্রোটোকল স্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হয়।

পরবর্তী সময়ে এই নৌযোগাযোগ আরও সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালে সাদিয়া থেকে ধুবড়ী পর্যন্ত ৮৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রহ্মপুত্র নদকে ‘জাতীয় জলপথ-২’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

দীর্ঘ সময় পর ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশ হয়ে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের এই পরীক্ষামূলক যাত্রা সেই পুরোনো নৌযোগাযোগকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, ব্রহ্মপুত্রের নৌপথ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে উত্তর-পূর্ব ভারতের পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আঞ্চলিক বাণিজ্যও আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।


রিপোর্টার্স২৪/ঝুম

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪