সাদ্দাম হোসেন, ঠাকুরগাঁও : ঠাকুরগাঁওয়ের সীমান্ত উপজেলা রানীশংকৈলের পশ্চিম কাদি হাট জোতপাড়া গ্রামের ফাতেমা বেগম। একসময় অভাব-অনটনের কারণে যার সংসার টিকিয়ে রাখাই ছিল কঠিন, আজ তিনিই দুই শতাধিক মানুষের জীবিকার আশ্রয়। তার পাপোষ তৈরির ক্ষুদ্র কারখানা এখন গ্রামীণ শিল্পের উজ্জ্বল উদাহরণ। আর তার এই উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দিতে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসন।
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা বলেন, ‘ফাতেমা বেগমের মতো মানুষই আমাদের সমাজের প্রকৃত পরিবর্তনকারী। একজন গ্রামীণ নারী হয়েও তিনি দুই শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন—এটি সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ী।’
তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসন ফাতেমার মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পাশে থাকবে সবসময়। আমরা চাই, এই পণ্যগুলো আন্তর্জাতিক মানে তৈরি হোক। এজন্য প্রশিক্ষণ, আধুনিকীকরণ ও বাজারজাতকরণে জেলা প্রশাসন থেকে সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়া হবে।
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক জানান, বর্তমানে এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণেই ব্যস্ত। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজার পেতে হলে পণ্যে আধুনিক রুচি, মান ও ডিজাইনের সমন্বয় ঘটাতে হবে। মানুষের রুচি পরিবর্তন হচ্ছে। তাই তাদের পণ্যগুলোও আধুনিক মানে কনভার্ট করা দরকার।
ফাতেমার সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প:
দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত শৈশব কাটানো ফাতেমা বেগমের জীবন ছিল এক নিরব যুদ্ধের নাম। গ্রামে স্কুল না থাকায় পড়াশোনা থেমে যায় ছোটবেলাতেই। অল্প বয়সে বিয়ে, তারপর একের পর এক আর্থিক বিপর্যয়। যখন সংসারে একবেলা খাওয়া দুষ্কর, তখনও তিনি হার মানেননি।
স্বামী বাবুল হক কাজের সন্ধানে ভারতে যান ১৯৯৯ সালে। আড়াই বছর পর ফেরেন মাত্র ১৫ হাজার টাকা হাতে নিয়ে। সে টাকা দিয়েও দোকান টিকিয়ে রাখা যায়নি। কিন্তু হতাশার অন্ধকারে তখনই ফাতেমা দেখেন একটুখানি আলো—নিজের হাতে কিছু করার স্বপ্ন।
স্থানীয় এনজিও আরডিআরএস-বাংলাদেশ থেকে মাত্র ৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু করেন পাপোস তৈরির কাজ। বাড়ির উঠোনে স্থাপন করেন প্রথম চারটি মেশিন। দিনরাত পরিশ্রমে ধীরে ধীরে জমে ওঠে তার ছোট্ট কারখানা।
আজ তার দুটি কারখানায় রয়েছে ৪৭টি মেশিন, তার অধীনে কর্মরত দুই শতাধিক নারী-পুরুষ। প্রতিদিন উৎপাদিত হয় তিন হাজারের বেশি পাপোস দেশের সীমা ছাড়িয়ে এখন বিদেশেও রপ্তানী হচ্ছে।
ফাতেমা বলেন, “একসময় মনে হতো সব শেষ। কিন্তু আমি হার মানিনি। এখন আমাদের কাজেই এলাকার অনেক পরিবারের মুখে হাসি ফুটেছে।”
শ্রমিক রহিমা খাতুন বলেন,‘আগে সংসার চালাতে হিমশিম খেতাম। এখন প্রতিদিন ৩০০ টাকা আয় হয়—বাচ্চাদের মুখে হাসি ফিরেছে।’
কলেজছাত্রী আয়শা সিদ্দিকা জানান, ‘ফাতেমা আপার জন্যই এখন নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই চালাতে পারছি।’
ঠাকুরগাঁওয়ের সাংস্কৃতির ব্যক্তি অধ্যাপক মনোতোষ কুমার দেব বলেন, আজ ফাতেমা শুধু একজন উদ্যোক্তা নন—তিনি তার গ্রামের নারীদের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক। একসময় যে নারী হাত বাড়াতেন সাহায্যের জন্য, এখন তিনি অন্যদের হাতে তুলে দিচ্ছেন কাজ, আত্মসম্মান আর স্বপ্ন দেখার সাহস।
রিপোর্টার্স২৪/এসএন