| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

এলপিজি সিন্ডিকেটের কারসাজিতে অসহায় সরকার ও জনগণ

reporter
  • আপডেট টাইম: জানুয়ারী ০৮, ২০২৬ ইং | ১৮:১৪:৬:অপরাহ্ন  |  42161 বার পঠিত
এলপিজি সিন্ডিকেটের কারসাজিতে অসহায় সরকার ও জনগণ

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

০১. হঠাৎ করেই গণমাধ্যমে চোখ পড়ল, চোখ আটকে গেল একটি সংবাদে। সংবাদটি হলো—‘বৃহস্পতিবার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সারাদেশে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ রাখা হবে বলে জানিয়েছে তারা।’ প্রশ্ন জাগে মনে—তাদের কী দাবি? সব দাবিই কি কেবল এই ব্যবসায়ীদের? ভোক্তা বা দেশের নাগরিকদের কি কোনো দাবি থাকতে পারে না? জনগণকে জিম্মি করে এভাবে দাবি আদায়ের নামে যারা আন্দোলন করে, তারা কি আসলেই ব্যবসায়ী, নাকি লুটেরা?

ইতোমধ্যে গত কয়েক দিনে রান্নার জন্য অপরিহার্য এই পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের লাখ লাখ পরিবার দৈনন্দিন রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে শহুরে পরিবারে অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করার সুযোগও নেই। জীবনধারণের এমন গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ নিয়ে গত কয়েক দিনে যা হচ্ছে এবং পরিস্থিতির যে গতিপথ বোঝা যাচ্ছে, তা হতাশাজনক।

০২. বাজারে এমনভাবে সংকট তৈরি করেছে অসৎ ব্যবসায়ীরা যে, টাকা দিয়েও এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। সারা দেশে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ভোক্তা পর্যায়ে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না কোম্পানিগুলো। এ সুযোগে ভোক্তাদের জিম্মি করে দ্বিগুণ দামে এলপিজি বিক্রি করছে একদল অসাধু ব্যবসায়ী। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁর এলপিজি ব্যবহারকারীরা। ফোনে ১২ কেজি এলপিজির মূল্য ২২০০–২৫০০ টাকা বললেও সাংবাদিক বা টিভি ক্যামেরা দেখলে তা নেমে আসে ১৫০০ টাকায়। কেন—এর কোনো সদুত্তর নেই। বিক্রেতারা দাবি করেন, তারা ১৫০০ টাকায় বিক্রি করছেন; কিন্তু ক্রেতাদের অভিযোগ ভিন্ন। তারা জানান, ২২০০ থেকে ২৫০০ টাকায় এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে।

বড় কোম্পানিগুলো সাপ্লাই দিতে পারছে না—উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি গাড়ি একদিন গেলে চার-পাঁচ দিন পর লোড হয়। সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর দাবি, শীতে চাহিদা বেশি থাকলেও ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা ও জাহাজ সংকটের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, একটি বড় নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে এলপিজি আমদানি ব্যাহত হওয়াও অন্যতম কারণ। ফলে পুরো এলপিজি বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে এবং জনগণের পকেট কাটা হচ্ছে। কিন্তু সরকার নির্ধারিত পণ্যের দামে এভাবে বৃদ্ধি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

০৩. প্রতি মাসের শুরুতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) মূল্য নির্ধারণ করে দেয় বিইআরসি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকার নির্ধারিত সেই মূল্যে কখনোই এলপিজি বিক্রি হয় না। সিলিন্ডারপ্রতি ভোক্তার কাছ থেকে অতিরিক্ত ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। এই হিসাবে মাসে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ভোক্তার পকেট থেকে লুটে নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণে জানা যায়, দেশে বর্তমানে এলপিজির চাহিদা ৯০ লাখের বেশি। তাহলে কেন এই অরাজকতা?

এলপিজির এই পরিস্থিতির জন্য সংশ্লিষ্টরা একে অপরকে দোষারোপ করছে। খুচরা বিক্রেতারা দোষ দেন ডিলারদের, ডিলাররা বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানকে, আর প্রতিষ্ঠানগুলো দোষ চাপায় বিইআরসির ওপর। এই ফাঁকে ভোক্তারাই লুটপাটের শিকার হচ্ছেন।

০৪. বাজারে কিছু সংকট হয় বৈশ্বিক কারণে, আবার কিছু সংকট তৈরি হয় সচেতন কারসাজিতে। বাংলাদেশের এলপিজি সংকট নিঃসন্দেহে দ্বিতীয়টির উদাহরণ। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সিলিন্ডার উধাও করা হয়েছে। এটি দিনের আলোয় ডাকাতি। এলপিজি কোনো বিলাসী জ্বালানি নয়—এটি শহর ও উপশহরের লাখো পরিবারের রান্নাঘরের একমাত্র ভরসা। এর প্রভাব সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতেও পড়ছে।

সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে জনগণ লুট হচ্ছে, অথচ নিয়ন্ত্রণে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। এটি সরকারের নজিরবিহীন ব্যর্থতা।

০৫. শীত মৌসুমে এলপিজির চাহিদা বাড়বে—এটা নতুন কিছু নয়। তবুও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত না করায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। ভারতের মতো দেশে রাষ্ট্রীয় তদারকির কারণে বাজার নিয়ন্ত্রিত থাকে। বাংলাদেশে বাজার উন্মুক্ত হলেও শক্ত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলা হয়নি।

০৬. দাম ঘোষণা করাই যদি শেষ দায়িত্ব হয়, তবে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন কী? মাঠপর্যায়ে তদারকি ছাড়া মূল্য নির্ধারণ অর্থহীন। এলপিজি কোনো বিলাসী পণ্য নয়—এটি নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি। কৃত্রিম সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকারকে দ্রুত সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মজুত ও সরবরাহের তথ্য প্রকাশ এবং কঠোর নজরদারি চালু করতে হবে।

এলপি গ্যাস আমদানি, বিতরণ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত পক্ষগুলোর সমন্বয়হীনতায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে সরকারকে দ্রুত, যৌক্তিক ও কঠোর পদক্ষেপ নিতেই হবে।

(লেখক : রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক)

E-mail : [email protected]


আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল। এই বিভাগে লেখকের ‘মতামত’ একান্তই তার নিজস্ব; যার দায়ভার রিপোর্টার্স২৪ বহন করে না। ধন্যবাদ ]

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪