রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: পৃথিবীর বেশিরভাগ সংস্কৃতিতে বিয়ে মানেই আনন্দ, হাসি, গান আর উৎসব। কিন্তু চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের টুজিয়া সম্প্রদায়ে রয়েছে এক ব্যতিক্রমী ও আবেগঘন বিয়ের রীতি—যেখানে কনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনে নয়, বরং বিয়ের প্রায় এক মাস আগেই শুরু হয় কান্নার আয়োজন। এই প্রথা ‘ক্রাইং ম্যারেজ’ নামে পরিচিত।
প্রথম শুনতে বিষয়টি দুঃখজনক মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য, আবেগের বহিঃপ্রকাশ এবং সামাজিক মূল্যবোধ। কিং রাজবংশের শেষ সময়কাল (১৬৪৪–১৯১১) পর্যন্ত এই প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। আধুনিক নগরজীবনে এর চর্চা কমে গেলেও, গ্রামীণ ও পাহাড়ি টুজিয়া সমাজে আজও এই কান্না বিয়ের অপরিহার্য অংশ।
এই প্রথায় কান্না মানে শুধুই চোখের জল নয়। কনে ঐতিহ্যবাহী সুরে ‘ক্রাই সং’ নামে বিশেষ গান গেয়ে কাঁদে। এসব গানে ফুটে ওঠে তার শৈশব, পরিবারকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট, নতুন জীবনের ভয়-আশা, ভালোবাসা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ। অনেক কনে নিজেই এসব গান রচনা করে বা পরিবার থেকে শিখে নেয়।
প্রথা অনুযায়ী, কেউ কেউ বিয়ের এক মাস আগে থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে কান্না শুরু করে। কিছু অঞ্চলে আবার এই সময়কাল দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। সাধারণত বিয়ের এক মাস আগে কনে একটি নির্দিষ্ট ঘর বা হলে একা বসে প্রতিদিন প্রায় এক ঘণ্টা ধরে কাঁদে। দশ দিন পর তার সঙ্গে যোগ দেন মা, এরপর ধাপে ধাপে দাদি, নানি ও পরিবারের অন্যান্য বয়স্ক নারী সদস্যরা। এই প্রক্রিয়াকে স্থানীয়ভাবে ‘জুও তাং’ বা হলে বসে থাকা বলা হয়।
কিছু এলাকায় আয়োজন করা হয় ‘টেন সিস্টার গ্যাদারিং’, যেখানে কনের বান্ধবী ও আত্মীয়রা একত্রিত হয়ে কাঁদে ও গান গায়। এটি শুধু আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক সহমর্মিতা এবং কনের নতুন জীবনের জন্য শুভকামনার প্রতীক।
এই কান্নার পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক তাৎপর্য। প্রাচীনকালে অধিকাংশ বিয়ে হতো পিতামাতা বা ঘটকের সিদ্ধান্তে। কনের নিজের মত প্রকাশের সুযোগ ছিল সীমিত। তাই কান্না ও গানের মধ্য দিয়েই কনে তার অসন্তোষ, ভেতরের কষ্ট, প্রতিবাদ কিংবা প্রত্যাশা প্রকাশ করত। অনেক সময় এই গানগুলোতে ঘটকের প্রতি তিরস্কার কিংবা সমাজের কড়াকড়ির বিরুদ্ধে নীরব বিদ্রোহও উঠে আসত।
এমনকি একসময় কনে যথেষ্ট কান্না না করলে সমাজে তাকে অবহেলা করা হতো। তাকে দরিদ্র, অশিক্ষিত কিংবা আবেগহীন বলে মনে করা হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কনের মা পর্যন্ত তাকে শাসন করতেন—কারণ ভালোভাবে কান্না করতে না পারা মানে সামাজিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়া।
তাই টুজিয়া সমাজে এই কান্না কেবল দুঃখের প্রকাশ নয়; এটি কনের সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং নতুন জীবনের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতীক।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও এই রীতির গুরুত্ব অনেক। কান্নার মাধ্যমে কনে তার আবেগ মুক্ত করে, মানসিকভাবে নতুন জীবনের জন্য প্রস্তুত হয়। আধুনিক চীনে শহরাঞ্চলে এই প্রথা কমলেও গ্রামীণ ও পাহাড়ি অঞ্চলে এটি এখনও সুদৃঢ়ভাবে টিকে আছে।
টুজিয়া সম্প্রদায়ের কাছে ‘ক্রাইং ম্যারেজ’ শুধুই একটি রীতি নয়—এটি ইতিহাস, আবেগ, পরিবার এবং সংস্কৃতির এক অনন্য মিলন।
সূত্র: ডেইলি চায়না
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম