আশিস গুপ্ত, নতুন দিল্লি:
জি-৭ সম্মেলন শুরু হতে এখন মাত্র ক’দিন বাকি। এর ঠিক আগেই, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছেন যে তিনি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির আমন্ত্রণে সম্মেলনে যোগ দিতে কানাডা সফরে যাচ্ছেন। এ সফর ও আমন্ত্রণ ভারত-কানাডা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক নাটকীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা গত ২০ মাস ধরে তীব্র উত্তেজনার মধ্যে ছিল।
শুক্রবার (৬ জুন) সন্ধ্যায় এক্স (সাবেক টুইটার)-এ ঘোষণা দিয়ে মোদি লেখেন, “সম্মেলনে আমাদের সাক্ষাতের অপেক্ষায় রয়েছি।” তিনি আরও যোগ করেন, “উজ্জ্বল গণতন্ত্র এবং গভীর জনসম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ ভারত ও কানাডা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অভিন্ন স্বার্থকে সামনে রেখে নব উদ্যমে একসাথে কাজ করবে।”
মোদি শেষবার কানাডা সফর করেন ২০১৫ সালে। সেই থেকে দু’দেশের সম্পর্কে নানান চড়াই-উতরাই এসেছে, বিশেষত হরদীপ সিং নিজ্জারের হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের পর থেকে, যখন ২০২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো কানাডার সংসদে ঘোষণা দেন যে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি জড়িত।
এই অভিযোগের পর ভারত তা সরাসরি অস্বীকার করে এবং দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক কার্যত নিম্নপর্যায়ে চলে যায়। দূতাবাসে স্টাফ সংখ্যা কমানো হয়, উভয় দেশের হাইকমিশনারদের প্রত্যাহার করা হয়, এবং পারস্পরিক উত্তেজনা তীব্র হয়ে ওঠে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে কানাডিয়ান রয়্যাল মাউন্টেড পুলিশ (RCMP) অভিযোগ করে যে ভারতের সঙ্গে কানাডায় "ব্যাপক হিংসা" ঘটনার যোগসূত্র রয়েছে। এমনকি কানাডার উপ-পররাষ্ট্র সচিব ডেভিড মরিসন এক পার্লামেন্টারি শুনানিতে বলেন যে তিনি একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এই ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। ভারত একে "অযৌক্তিক" ও "ভিত্তিহীন" বলে উড়িয়ে দেয়।
এমন এক প্রেক্ষাপটে কানাডার নতুন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নেতৃত্বে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। মোদির আমন্ত্রণ গ্রহণ এবং উভয় দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে আবারও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত—এই দুটি বিষয়কেই এই সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কার্নির কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, “দুই পক্ষই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগগুলির সমাধানে একসাথে কাজ করার ব্যাপারে একমত হয়েছে।” যদিও মোদির ঘোষণায় এ বিষয়ে সরাসরি কোনো উল্লেখ নেই, কানাডার বিবৃতি ও পরে সংবাদ সম্মেলনে কার্নির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত।
সংবাদ সম্মেলনে কার্নি বলেন, “আমরা এখন আইন প্রয়োগকারী সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছি, এবং এটাই আমাদের অগ্রগতির প্রমাণ। এই আলোচনার ফলে জবাবদিহিতার বিষয়টিকে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি নিজ্জার হত্যা মামলায় মোদির জড়িত থাকার বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানালেও বলেন, “কানাডা আইনের শাসনের দেশ। এখানে বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে এবং আমি সেই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে চাই না।”
কার্নি ব্যাখ্যা করেন, “জি-৭ সভাপতি হিসেবে কানাডা বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যু যেমন জ্বালানি নিরাপত্তা, ডিজিটাল ভবিষ্যৎ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়ে কাজ করছে। এসব আলোচনায় ভারতের মতো দেশগুলোর উপস্থিতি জরুরি—যা বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র। তাই এই প্রেক্ষাপটেই আমি প্রধানমন্ত্রী মোদিকে আমন্ত্রণ জানাই।”
জি-৮ থেকে জি-৭ হয়ে ওঠা এই গোষ্ঠীর সম্মেলনে আগে ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং পাঁচবার বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছেন। মোদি ২০১৯ সালে প্রথমবার জি-৭ সম্মেলনে অংশ নেন এবং এরপর আরও চারবার এই ফোরামে ভারতীয় প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
কানাডা ও ভারতের সম্পর্ক পুনর্গঠনের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকছে। এই সফর দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাসের বরফ গলাতে কতটা সহায়ক হবে, তা ভবিষ্যতেই বোঝা যাবে। তবে এই মুহূর্তে স্পষ্ট, দুই দেশই সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজানোর পথ খুঁজছে—যদিও পুরনো প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও বাকি।