আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের নাজুক যুদ্ধবিরতি নতুন করে চাপে পড়েছে। শনিবার পাকিস্তানে নির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আগে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। একদিকে ওয়াশিংটন অভিযোগ করছে, হরমুজ প্রণালী নিয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে তেহরান; অন্যদিকে লেবাননে ইসরায়েলের হামলাকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে ইরান।শুক্রবার (১০ এপ্রিল) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে ইরানের প্রায় সম্পূর্ণ অবরোধ প্রত্যাহারের কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। অথচ এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বে ব্যবহৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত, যুদ্ধবিরতির প্রথম ২৪ ঘণ্টায় সেখানে মাত্র একটি তেলবাহী জাহাজ ও পাঁচটি শুকনো পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের সমালোচনা করে বলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল চলাচল স্বাভাবিক করতে তেহরান ‘খুবই খারাপ কাজ করছে’ এবং এটি চুক্তির পরিপন্থী। তিনি ইঙ্গিত দেন, দ্রুতই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে, যদিও কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানাননি।
অন্যদিকে, লেবানন সীমান্তে নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির সেনাবাহিনী জানায়, উত্তর ইসরায়েলের দিকে ছোড়া রকেটের জবাবে লেবাননে ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। ইরান-সমর্থিত সংগঠন হিজবুল্লাহ হাইফা শহরের সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে দাবি করেছে, যদিও সেটি প্রতিহত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দাবি, বর্তমান যুদ্ধবিরতি লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করে না। তবে ইরান ও মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান বলছে, চুক্তির অংশ হিসেবেই লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার
মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ জানিয়েছেন, লেবাননসহ ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররা যুদ্ধবিরতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের ওপর হামলার জন্য দায়ীদের “শাস্তি পেতেই হবে” এবং ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাত নিরসনে শনিবার পাকিস্তানে প্রথম দফার সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিতে পারেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
ইরান ইতোমধ্যে একটি ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার স্বীকৃতি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, লেবাননের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু করতে তিনি প্রস্তুত। তবে এসব আলোচনার মূল শর্ত হিসেবে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
লেবাননের একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, তারা যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে ইসরায়েলের সঙ্গে বৃহত্তর আলোচনায় যেতে চায়। তবে হিজবুল্লাহ সরাসরি ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং প্রথমে পূর্ণ যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া এবং লেবানন ইস্যুতে মতপার্থক্য দূর না হলে আসন্ন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা জটিল হয়ে উঠতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি