| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

২০ মাসে ধর্ষণ নির্যাতনে নিহত ৬৪৩ শিশু

৫ বছরে ২ সহস্রাধিক শিশু ধর্ষণ, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা

reporter
  • আপডেট টাইম: মে ২২, ২০২৬ ইং | ১১:৫৮:৫২:পূর্বাহ্ন  |  ৩৯০৭৩ বার পঠিত
২০ মাসে ধর্ষণ নির্যাতনে নিহত ৬৪৩ শিশু

স্টাফ রিপোর্টার: দেশে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, শারীরিক নির্যাতন ও হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধে একের পর এক শিশু প্রাণ হারাচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিচারহীনতা, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা এবং অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি না হওয়াকে এই পরিস্থিতির বড় কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ২০ মাসে সারা দেশে অন্তত ৬৪৩ শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৩২ জনের বেশি শিশু প্রাণ হারিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই নিহত হয়েছে ২০৩ শিশু। অন্যদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে ৪৭৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনায়।

এইচআরএসএসের তথ্যে আরও উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে অন্তত এক হাজার ৮৯০ শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৪০৭ শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং ৪৮৩ শিশু নিহত হয়েছে। একই সময়ে ৫৮০ শিশু ধর্ষণ এবং ৩১৮ শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

সর্বশেষ রাজধানীর পল্লবী এলাকায় শিশু শিক্ষার্থী রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত মঙ্গলবার সংঘটিত ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার সোহেলের বাসা থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। রামিসার বাবা-মায়ের আহাজারি, ক্ষোভ ও বিচার দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

এইচআরএসএস বলছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ৫১৯ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩২৪ শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার এবং ১৯৫ শিশু প্রাণ হারিয়েছে।

এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে অন্তত দুই হাজার ৬১৭ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১৬ জন ধর্ষণের শিকার, যাদের ৫৫০ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। এছাড়া ২৩০ নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৩ জনকে। এসব ঘটনার পর আত্মহত্যা করেছেন অন্তত ১১ নারী।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫০৪ নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৭০ জনই শিশু।

শুধু চলতি বছরের এপ্রিল মাসেই ২৯৪ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬৮ জন, যাদের ৩০ জনই শিশু ও কিশোরী। একই মাসে ১৩ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এছাড়া যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৭৯ জন, যাদের মধ্যে ৪০ জন শিশু।

বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও দেশের শিশু সুরক্ষার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে মোট দুই হাজার ৩৩৯টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০২১ সালে ৭৭৪টি, ২০২২ সালে ৫৬১টি, ২০২৩ সালে ৩১৪টি, ২০২৪ সালে ২৩৪টি এবং ২০২৫ সালে ৪৫৬টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ৯৪টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

অর্থাৎ ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪৪৯ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

একইভাবে শিশু ধর্ষণচেষ্টার ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে ১৮৫টি, ২০২২ সালে ১০১টি, ২০২৩ সালে ৮৫টি, ২০২৪ সালে ৬৬টি এবং ২০২৫ সালে ১৬৭টি ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত এমন ৩৪টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

আদালতের জিআর শাখা সূত্রে জানা গেছে, শুধু ঢাকার বিভিন্ন আদালতেই শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত প্রায় তিন হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত রাজধানীর ৫০টি থানায় ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে অন্তত ২১৪টি মামলা দায়ের হয়েছে।

বিচারহীনতার সংস্কৃতিই বড় কারণ মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের মতে, অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়া এবং মামলার দীর্ঘসূত্রতাই এসব অপরাধ বাড়ার অন্যতম কারণ।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার বলেন, তদন্তে বিলম্ব, সময়মতো মেডিক্যাল রিপোর্ট না পাওয়া এবং সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে না পারা বিচার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছে।

তিনি বলেন, “তদন্ত কর্মকর্তাদের ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর মামলার পাশাপাশি অন্যান্য দায়িত্বও পালন করতে হয়। আবার অনেক ট্রাইব্যুনালে নারী ও শিশু নির্যাতনের পাশাপাশি মানবপাচার ও শিশু আইনের মামলাও পরিচালিত হয়। ফলে মামলার জট বাড়ছে।”

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্ব এবং সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে না পারাই মূলত বিচার বিলম্বের বড় কারণ।

অন্যদিকে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, “একটির পর একটি শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা প্রমাণ করছে দেশের বিদ্যমান শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর নয়।

এদিকে পল্লবীর আলোচিত রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় প্রধান আসামি সোহেল এবং তার সহযোগী স্ত্রীকে ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেন, মূল আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।


রিপোর্টার্স২৪/ ঝুম

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪