| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

বাজেটে আয়কর বৃদ্ধি মধ্যবিত্তের মরণফাঁদ: আখতার

reporter
  • আপডেট টাইম: জুন ২৫, ২০২৬ ইং | ২০:০৩:৫৩:অপরাহ্ন  |  ১৩৫৬ বার পঠিত
বাজেটে আয়কর বৃদ্ধি মধ্যবিত্তের মরণফাঁদ: আখতার

স্টাফ রিপোর্টার: প্রস্তাবিত বাজেটে যে আয়কর বৃদ্ধি করা হয়েছে, তা মধ্যবিত্তের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।

আখতার হোসেন বলেন, আমরা যদি এই বাজেটের আয়করের দিকে একটু তাকাই, তাহলে দেখি আয়করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে, অর্থাৎ ২৫ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি আয় হলেই পরবর্তী ধাপে ৩ লাখ টাকার জন্য ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। আমরা যদি বিষয়টি খেয়াল করি, গত বছর এই হার ছিল ৫ শতাংশ। এখন যখন তা ১০ শতাংশ করা হয়েছে, তখন এটি সরাসরি মধ্যবিত্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর প্রভাব ফেলছে। কোনো ব্যক্তি যদি মাসে ৩৫ হাজার টাকা আয় করেন, তাহলে বছর শেষে তাকে যে কর দিতে হয়, তা আগে ৫ শতাংশ হারে ছিল ৪২০ টাকা। এখন তা বেড়ে ৬২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। মধ্যবিত্তের ওপর প্রথমে যে আয়কর সেই আয়করের ওপরে ৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটি মধ্যবিত্তের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা যদি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দিকে তাকাই, তাহলে দেখি তাদের ওপর অগ্রিম কর আরোপ করা হয়েছে। গ্রামের দোকানদারদের বলা হচ্ছে, তাদের ০.২ শতাংশ কর দিতে হবে। কিন্তু এটি অগ্রিম কর। অর্থাৎ যখন তারা মালপত্র দোকানে নিয়ে আসছেন, তখনই। যদি তারা ১ হাজার টাকার মালপত্র ক্রয় করেন, তাহলে দোকানে আনার সময়ই সরকারকে দুই টাকা কর দিতে হবে। যে পণ্য এখনো বিক্রি হয়নি, সেই পণ্যের ওপরই বিক্রির আগেই, কোনো লাভ হওয়ার আগেই যদি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কর ও ভ্যাট আদায় করা হয়, তাহলে আমাদের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পথের ফকির হতে আর দেরি হবে না, মাননীয় স্পিকার। তাদের কার্যত রুদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

এনসিপির এই সংসদ সদস্য আরও বলেন, আমরা কৃষি বাজেটের দিকে একটু তাকিয়ে দেখি। গত বছর কৃষি খাতে বাজেট ছিল ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। এ বছর তা হয়েছে ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। আমরা এমন একটি বাজেট করেছি, যেখানে গত বছরের তুলনায় মোট বাজেট ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু কৃষি খাতে বৃদ্ধি করা হয়েছে মাত্র ১ থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা। এটি আসলে বৃদ্ধি না করারই নামান্তর।

আখতার বলেন, ‘আমাদের কৃষি খাত নানাভাবে অবহেলিত হয়ে আছে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হতে পারে, সার ও কীটনাশকের ওপর যে সাড়ে ৭ শতাংশ কর ও ভ্যাট ছিল, তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু সার ও কীটনাশকের ওপর কর ও ভ্যাট কমানোর ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক কতটা লাভবান হবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ, এর সুবিধা মূলত ব্যবসায়ীরাই পেয়ে থাকেন। কর ও ভ্যাট কমানোর কারণে সার ও কীটনাশকের দাম বাস্তবে কমবে কি না, তা তদারকির কোনো সুস্পষ্ট ব্যবস্থা এখনো করা হয়নি।

তিনি বলেন, কৃষি কার্ডের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের যেসব কৃষক প্রতিবছর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তাদের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ কোথায়? আমাদের তো কৃষিভিত্তিক দেশ হওয়ার কথা ছিল। ১৯৭৫ সালের দিকে যেখানে জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ৬২ শতাংশ, এখন তা ১০ থেকে ১১ শতাংশে নেমে এসেছে। আমরা কৃষিকে একেবারেই উপেক্ষা করে যাচ্ছি। এই বাজেটেও কৃষিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আমরা মনে করি, কৃষি খাতে বরাদ্দ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু ১ থেকে ১.৫ হাজার কোটি টাকা নয়, এমন পরিমাণে বাড়াতে হবে যাতে আমরা কৃষকদের ভর্তুকির আওতায় আনতে পারি এবং প্রকৃত অর্থে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি।

আখতার হোসেন বলেন, আমাদের শিক্ষা বাজেটের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনটি খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা। এই তিন খাতের মোট বাজেট দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, শিক্ষা খাতে মোট বাজেট দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা।

এই অতিরিক্ত ১৪ হাজার কোটি টাকা কোথায় ব্যয় করা হবে, তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। একই বিষয় ঘটছে এডিপির ক্ষেত্রেও। প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপিতে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অথচ গত বছর এবং তার আগের বছরে থোক বরাদ্দ ছিল যথাক্রমে ১০ হাজার কোটি ও ১১ হাজার কোটি টাকা। এ বছর তা বেড়ে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এত বড় উল্লম্ফনের কারণে এই বরাদ্দ সঠিকভাবে বণ্টিত হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা দেখেছি, সরকারি দল যখন বরাদ্দ বণ্টন করেছে, তখন নিজেদের আসনগুলোতে বরাদ্দ দিয়েছে, কিন্তু বিরোধী দলের আসনগুলোতে দেয়নি। এডিপির এই ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা সারা দেশে ন্যায়সঙ্গত, বৈষম্যহীন এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বণ্টন করা হবে, এ বিষয়ে আমরা নিশ্চয়তা চাই।

আখতার হোসেন বলেন, আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত নিয়েও কিছু কথা বলা প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট এবং অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। এটি অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু আমরা যদি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সম্প্রতি জারি করা এসআরওর দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব, এই সুবিধা মূলত বড় ব্যবসায়ী এবং যেসব প্রতিষ্ঠান সরকারের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির আওতায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিচালনা করছে, তারাই পাবে। কিন্তু আবাসিক গ্রাহক, কৃষক এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এর সুফল পাবেন না। এ কারণে আমরা মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চাই, প্রান্তিক পর্যায়ের তরুণ উদ্যোক্তা, কৃষক এবং আবাসিক গ্রাহকরাও যেন এই কর-সুবিধার আওতায় আসতে পারেন, সে জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে আমি অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

তিনি বলেন, আমরা এই বাজেটে অনেক বিষয় দেখেছি। তবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। যদি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা একটি অলস অর্থনীতি তৈরি করতে চাই, তাহলে তা শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। আমাদের বর্তমান সংকট হলো কর্মসংস্থানের সংকট। কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না করে যদি শুধু প্রণোদনা দেওয়া হয়, তাহলে জাতিকে স্থবির করে রাখার ঝুঁকি তৈরি হবে। তাছাড়া এই প্রণোদনা সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাবে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে যথাযথ গুরুত্ব না দিলে আমরা জাতিকে এগিয়ে নিতে পারব না।

আখতার আরও বলেন, অর্থমন্ত্রী তার ২৩৪ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তব্যের দ্বিতীয় পৃষ্ঠাতেই বলেছেন, অর্থনীতির বর্তমান বিপর্যয় এবং সামাজিক কাঠামোর ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হলে রাজনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু সেই রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতিফলন কি আমরা সরকারি দলের মধ্যে দেখতে পাই? জনগণ গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সরকারি দল সে বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। জনগণ স্বাধীন বিচার বিভাগের পক্ষে মত দিয়েছে, কিন্তু সে বিষয়েও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, আমরা যদি সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারি, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে না পারি এবং সংস্কার বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হই, তাহলে যেমন আইএমএফের কাছ থেকে অর্থমন্ত্রীকে হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে, তেমনি জনগণের কাছ থেকেও সরকারকে প্রত্যাখ্যাত হতে হবে। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, বাজেট বাস্তবায়নের সময় জনগণের রায়কে সম্মান জানিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হোক এবং যথাযথ পর্যালোচনার মাধ্যমে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া হোক।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪