স্টাফ রিপোর্টার: বিশ্বকাপ এলেই ঢাকার কূটনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয় ভিন্ন এক আবহ। মাঠের লড়াই ছাপিয়ে ফুটবল হয়ে ওঠে সম্পর্ক উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা বার্তা, সমর্থকদের সঙ্গে খেলা দেখা, সাংস্কৃতিক আয়োজন, বিশ্ববিদ্যালয় সফর ও বিভিন্ন জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যবহার করছেন ‘ফুটবল কূটনীতি’।
বিশেষ করে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নরওয়েসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাস বিশ্বকাপকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আধুনিক ‘সফট পাওয়ার’ কূটনীতির একটি কার্যকর উদাহরণ।
ব্রাজিল-ভক্তদের ভালোবাসায় মুগ্ধ দূতাবাস
বাংলাদেশে ব্রাজিলের বিপুলসংখ্যক সমর্থক থাকায় বিশ্বকাপ ঘিরে দেশটির দূতাবাসের আয়োজন থাকে বিশেষ। ঢাকায় নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত পাওলো ফার্নান্দো দিয়াস ফেরেস বিভিন্ন ফুটবল আয়োজনে অংশ নেন। দল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর বাংলাদেশের সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, জয়-পরাজয় খেলার অংশ হলেও বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা ব্রাজিল কখনো ভুলবে না।
ব্রাজিল দূতাবাস নিয়মিত ফুটবলভিত্তিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্কুল কার্যক্রম ও ক্রীড়া বিনিময় কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে।
আর্জেন্টিনার সঙ্গে ফুটবলে নতুন সম্পর্ক
বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিনের। লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনা দলের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে ঢাকায় নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসা বিশ্বকাপজুড়ে সক্রিয় ছিলেন।
সমর্থকদের সঙ্গে খেলা দেখা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ এবং ফুটবলভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, ফুটবলই বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
ফ্রান্স-যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের কৌশল
ফ্রান্সের দূতাবাস ফুটবলকে সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে তরুণদের সঙ্গে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। তাদের মতে, খেলাধুলা বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরির শক্তিশালী মাধ্যম।
যুক্তরাষ্ট্রও বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ক্রীড়া কার্যক্রম, যুব উন্নয়ন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশ হাইকমিশন ফুটবলভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
নরওয়ের ‘দ্বিতীয় দল’ প্রচারণা
বিশ্বকাপ চলাকালে ঢাকায় নরওয়ের দূতাবাস বাংলাদেশিদের নরওয়েকে ‘দ্বিতীয় দল’ হিসেবে সমর্থনের আহ্বান জানায়। শান্তি, জলবায়ু ও উন্নয়ন সহযোগিতার পাশাপাশি ফুটবলের মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরির বার্তা দেয় তারা।
ব্রাজিলের বিপক্ষে নরওয়ের ম্যাচ উপলক্ষে দুই দেশের দূতাবাস যৌথ ভিডিও বার্তাও প্রকাশ করে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সম্মানের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
ফুটবল এখন কূটনীতির আন্তর্জাতিক ভাষা
আধুনিক কূটনীতিতে রাষ্ট্রদূতদের কাজ এখন আর শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও জনসম্পৃক্ত কার্যক্রমও হয়ে উঠেছে সম্পর্ক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
ক্রীড়া কূটনীতি গবেষকদের মতে, ফুটবল এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে সরকার, কূটনীতিক ও সাধারণ মানুষ একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। মাঠে দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও কূটনীতির মাঠে ফুটবল বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক শক্তিশালী করার একটি কার্যকর মাধ্যম।