রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: চলতি বছরের মে মাস থেকে একের পর এক তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে ইউরোপজুড়ে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, চরম এই আবহাওয়া আর সাময়িক কোনো ঘটনা নয়; বরং ইউরোপের গ্রীষ্মকালের একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী জুন মাসটি ছিল পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ জুন। একই সঙ্গে বৈশ্বিকভাবে এটি ছিল ইতিহাসের দ্বিতীয় উষ্ণতম জুন। প্রাক-শিল্পায়ন যুগের গড় তাপমাত্রার তুলনায় এ সময় তাপমাত্রা ছিল ১ দশমিক ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস (C3S) এবং ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের (ইসিএমডব্লিউএফ) বৃহস্পতিবার প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, শুধু স্থলভাগ নয়, জুন মাসে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও ইতিহাসের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থায় ক্রমাগত তাপ জমা হওয়ারই স্পষ্ট ইঙ্গিত।
ইসিএমডব্লিউএফের জলবায়ুবিষয়ক কৌশলগত প্রধান সামান্থা বার্গেস বলেন, “এই রেকর্ডগুলো প্রমাণ করে, তাপপ্রবাহের তীব্রতা ক্রমাগত বাড়ছে, সমুদ্রের পানি দীর্ঘ সময় ধরে উষ্ণ থাকছে এবং ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ, বাস্তুসংস্থান ও অবকাঠামোর ঝুঁকি বাড়ছে।”
গত জুনের শেষ দিকে পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। এতে জার্মানি, চেক প্রজাতন্ত্রসহ কয়েকটি দেশে মাসিক ও সর্বকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে যায়। এর আগে মে মাসেও অঞ্চলটিতে অস্বাভাবিক গরম অনুভূত হয়েছিল। জুলাইয়ের শুরুতেও নতুন করে আরেকটি তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে, যা ইউরোপের গ্রীষ্মে চরম আবহাওয়ার দীর্ঘস্থায়ী প্রবণতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, একের পর এক তাপপ্রবাহের ঘটনা প্রমাণ করছে যে, চরম গরম এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি ইউরোপের গ্রীষ্মের নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।
তীব্র তাপপ্রবাহের প্রভাব শুধু উচ্চ তাপমাত্রার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল, বিশেষ করে আইবেরীয় উপদ্বীপ (স্পেন ও পর্তুগাল), দক্ষিণ ফ্রান্স এবং পূর্ব ইউরোপের কিছু এলাকায় তীব্র শুষ্ক আবহাওয়া দেখা দিয়েছে। এর ফলে দাবানলের ঝুঁকি বেড়েছে, নদ-নদীর পানির প্রবাহ কমেছে এবং খরা পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা পর্ষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ওটমার এডেনহোফার বলেন, কম ব্যয়ে ২০৪০ ও ২০৫০ সালের জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ইউরোপকে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে হবে।
গত মার্চে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কৃষি খাতে কিছু অগ্রগতি হলেও কার্বন নিঃসরণ কমানোর গতি ও পরিধি এখনও যথেষ্ট নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষকদের জীবিকা রক্ষা, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা এবং জলবায়ু সহনশীলতা অর্জনে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এল নিনোর প্রভাব
এদিকে ভূমধ্যসাগরের পশ্চিমাঞ্চল এবং আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলীয় এলাকায় তীব্র সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়েছে, যা সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
ইইউর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিকভাবে ২০২৬ সালের জুন মাস ছিল বিশ্বের বরফমুক্ত মহাসাগরগুলোর ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ জুন। এর আগে ২০২৪ সালে গড়া রেকর্ডও এবার সামান্য ব্যবধানে ছাড়িয়ে গেছে।
বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, এ পরিস্থিতির পেছনে আংশিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠা ‘এল নিনো’ প্রভাব কাজ করছে। এল নিনো এমন একটি জলবায়ুগত প্রক্রিয়া, যার ফলে ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি উষ্ণ হয়ে ওঠে।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ুবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রধান কারণ মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তন। যদিও বৈশ্বিক উষ্ণতায় এল নিনোর ভূমিকা কতটা, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও মতভেদ রয়েছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, একের পর এক তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড প্রমাণ করছে যে পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থায় বিপুল পরিমাণ তাপ জমা হচ্ছে। এর ফলে ঘন ঘন তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য, বাস্তুসংস্থান এবং অবকাঠামোর জন্য ক্রমেই বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
সূত্র: ইউরোনিউজ
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম