রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: রুমি (ছদ্মনাম) দেশের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। মেধাবী ও উচ্চশিক্ষিত এই নারী এখন মাদকাসক্তির কারণে পরিবার, স্বামী, সংসার এমনকি নিজের সন্তানের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
শুরুটা হয়েছিল ধূমপানের মাধ্যমে। পরে ধীরে ধীরে ইয়াবায় আসক্ত হন তিনি। একপর্যায়ে হেরোইনের মতো ভয়াবহ মাদকে জড়িয়ে পড়ে তার জীবন। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে একসময় তিনি পরিবার থেকেও দূরে সরে যান।
রুমির মতো অন্তত ৪৯ নারীর সঙ্গে কথা বলে একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। বর্তমানে তারা ঢাকা আহছানিয়া মিশন নারী মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চিকিৎসাধীন এসব নারীর প্রত্যেকেই দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত। তাদের বড় একটি অংশ ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। অনেকের পরিবারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের যোগাযোগ রয়েছে।
চিকিৎসাধীন নারীদের ভাষ্য, শুরুতে তারা মাদকের ক্রেতা ছিলেন। পরে ধীরে ধীরে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হন এবং অনেকে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়েন।
চিকিৎসাধীন এক নারী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার বিয়ে হয়। স্বামীর মাধ্যমে তিনি মাদকের সঙ্গে পরিচিত হন। পরে ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে পড়েন। সন্তান জন্মের পর তার আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। তিনি প্রায়ই অতিরিক্ত উত্তেজিত ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতেন। এর ফলে দাম্পত্য সম্পর্কে অবনতি ঘটে এবং একপর্যায়ে বিচ্ছেদ হয়।
পরবর্তীতে দ্বিতীয়বার বিয়ে করলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। মাদকের কারণে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিও হারান তিনি। দীর্ঘদিনের আসক্তিতে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে বর্তমানে তিনি আহছানিয়া মিশনের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
আহছানিয়া মিশনের গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য
ঢাকা আহছানিয়া মিশনের পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। নারী মাদকসেবীদের একটি বড় অংশ ইয়াবায় আসক্ত।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৬২ জন নারী ঢাকা আহছানিয়া মিশন নারী মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৩ জন দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত। ছয়জন মাদকের কারণে গুরুতর মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত।
বয়সভিত্তিক হিসাবে, চিকিৎসাধীনদের মধ্যে ১৪ থেকে ২৫ বছর বয়সী ২৪ জন, ২৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ২১ জন, ৩৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ১৫ জন এবং ৪৬ থেকে ৫৫ বছর বয়সী দুইজন রয়েছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৮ জন ঢাকা জেলার বাসিন্দা।
ঢাকা আহছানিয়া মিশন নারী মাদকাসক্তি কেন্দ্রের হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ বিভাগের প্রধান ইকবাল মাসুদ বলেন, ‘বর্তমানে উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েদের মধ্যেও মাদকাসক্তির প্রবণতা বাড়ছে। বাবা-মায়ের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং পারিবারিক অবহেলার কারণে অনেকেই অল্প বয়সে মাদকে জড়িয়ে পড়ছেন।’
মাদকের কারণে অপরাধে জড়াচ্ছেন নারীরাও
নারীরা শুধু মাদক সেবনেই নয়, মাদক কারবারেও জড়িয়ে পড়ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, আগের তুলনায় দেশে নারী মাদকাসক্তের সংখ্যা বেড়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের গোয়েন্দা বিভাগের উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৮২ লাখের বেশি মানুষ মাদকাসক্ত। মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে মানসের হিসাবে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় সোয়া কোটি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, দেশে পাঁচ লাখের বেশি নারী মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে মাদক বিক্রেতা, ক্রেতা ও সেবনকারী—সব শ্রেণির মানুষ রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেক তরুণী ও শিক্ষার্থীও রয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তর ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, দেশে নারীদের মধ্যে মাদকাসক্তি ও মাদক কারবারে সম্পৃক্ততা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। সংঘবদ্ধ মাদক চক্র এসব নারীকে ব্যবহার করে মাদক ব্যবসার বিস্তার ঘটাচ্ছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার মাদক কারবারির মধ্যে ২৭ হাজার ৩০০ জন নারী, যা মোট মাদক কারবারির প্রায় ১৭ শতাংশ।
মানসের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত তিন হাজার ২০০-এর বেশি মাদক কারবারির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন নারী মাদক কারবারির মধ্যে প্রায় তিনজন মাদকাসক্ত। মাদকাসক্ত নারীদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ ইয়াবায় আসক্ত।
সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে ছড়াচ্ছে মাদক
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্পকেন্দ্রিক অন্তত ৪৫ জন নারী ভাসমান মাদক কারবারে জড়িত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী মাদক বিক্রেতা জানান, মাদক বিক্রি করে তিনি ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন। ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক কারবারিরাই তাকে এই কাজে যুক্ত করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাসমান মাদক বিক্রেতাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। সংঘবদ্ধ মাদক চক্রের মাধ্যমে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ধীরে ধীরে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম