ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দিক থেকে জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়েছে পাকিস্তান। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হামলার পর ইসলামাবাদে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধের প্রভাবের মধ্যে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতি পাকিস্তানের জন্য দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের ভূমিকা ধরে রাখার চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ, অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কারণে প্রয়োজন হলে রিয়াদের পাশে দাঁড়ানোর চাপও রয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান ভূমিকা রেখেছিল। একই সময়ে দেশটির সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার হয়েছে। গত বছর স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় বর্তমানে সৌদি আরবে পাকিস্তানের হাজারো সেনাসদস্য এবং যুদ্ধবিমান ইউনিট মোতায়েন রয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে ইরানের হামলার ঘটনাতেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল ইসলামাবাদ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার পর ইরানকে ঘিরে পাকিস্তানের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কারণ, নতুন করে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
গত সোমবার হুথিদের নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে সৌদি আরব হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ তুলে সৌদি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে হুতিরা। এতে দীর্ঘদিনের কার্যকর যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলেও এখন পর্যন্ত সংঘর্ষ সীমিত পর্যায়েই রয়েছে।
পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব ইরানকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, সৌদি আরবের ওপর হামলাকে তারা পাকিস্তানের নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পৃক্ত হিসেবে বিবেচনা করছে। এটি ইসলামাবাদের জন্য একটি ‘রেড লাইন’।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, উত্তেজনা এত দ্রুত বাড়বে, তা পাকিস্তান আগে থেকে অনুমান করতে পারেনি।
পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন সৌদি অঞ্চলে পাকিস্তানের সেনাসদস্য মোতায়েন থাকায় পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। সংঘাত বাড়লে এসব সেনার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
ইসলামাবাদের আরেকটি বড় দুশ্চিন্তা হলো লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ। এই রুটে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে পাকিস্তানসহ বহু দেশের বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের কৌশলগত স্থাপনায় হামলা হলে প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তানকে সামরিক পদক্ষেপ নিতে হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জেনারেল গুলাম মোস্তফা বলেন, বর্তমানে ইসলামাবাদ সব পক্ষকে সংযত রাখার চেষ্টা করছে। তবে হুতিদের হামলা আরও বিস্তৃত হলে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে পাকিস্তান। দেশটির কর্মকর্তাদের মতে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের অবস্থানের সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আলির মতে, ইরানে নীতিনির্ধারণে সামরিক বাহিনীর প্রভাব আগের তুলনায় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পাকিস্তানও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ইরানের একটি প্রতিনিধিদলের নির্ধারিত ইসলামাবাদ সফরও পিছিয়ে যায়। পরে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল দুদিন বিলম্বে পাকিস্তান সফর করে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসার কথা ছিল।
এদিকে বৃহস্পতিবার নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দরাবি সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বর্তমান সংকট নিরসনে সংলাপ ও কূটনীতির বিকল্প নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক কূটনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে চাইলে পাকিস্তানকে একই সঙ্গে একাধিক স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। কারণ, সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপরও পাকিস্তানের অর্থনীতি অনেকাংশে নির্ভরশীল।
সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে পাকিস্তান সরকারকে জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন জরুরি ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল।
কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার মাধ্যমে শুধু কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানো নয়; বরং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাও ইসলামাবাদের অন্যতম লক্ষ্য।
একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা বলেন, নানা হতাশা থাকলেও মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা থেকে সরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। কারণ, এই উদ্যোগে পাকিস্তান উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক বিনিয়োগ করেছে এবং এটি সফল হওয়াও তাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান এমন এক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রয়োজন হলে তাকে স্পষ্টভাবে কোনো এক পক্ষের পাশে অবস্থান নিতে হতে পারে। মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের ভাষ্য, যুদ্ধ বন্ধ হওয়াই সবার জন্য সবচেয়ে ভালো সমাধান। কিন্তু সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে সহায়তা চাইলে পাকিস্তান তাদের সমর্থন দেবে, এ বিষয়ে ইসলামাবাদের অবস্থান স্পষ্ট।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম