চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি: দীর্ঘ তিন বছর পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ৩৬তম বার্ষিক সিনেট সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (৮ আগস্ট) বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. এ.আর. মল্লিক ভবনের উপাচার্য দপ্তরের সভাকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান। সভায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৪৮৯ কোটি ৯৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকার সংশোধিত বাজেট এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৫০৩ কোটি ৪৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকার মূল বাজেট উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. হাছান মিয়া। পরে সিনেট সভায় বাজেট দুটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
সভায় উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক, প্রশাসনিক, গবেষণা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে Institutional Quality Assurance Cell (IQAC) কাজ করছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত IQAC-এর উদ্যোগে ৩০টির বেশি প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি জানান, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে Outcome-Based Education (OBE) এবং অভিন্ন সেমিস্টার পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
গবেষণা খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষক গবেষণা অনুদান হিসেবে ১০ কোটি টাকা, এমফিলসহ অন্যান্য খাতে ৬৭ লাখ টাকা এবং পিএইচডি ও মাস্টার্স থিসিসে অনুদান দেওয়া হচ্ছে। আগামী অর্থবছরের জন্য গবেষণা খাতে ২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে উপাচার্য জানান, ৪৯ কোটি ৩৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা ব্যয়ে ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে Teacher-Students Complex (TSC) প্রতিষ্ঠাকরণ’ এবং ৬৭৮ কোটি ১৪ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক দুটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব (DPP) পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো, একাডেমিক কার্যক্রম ও গবেষণার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা অনেকাংশে দূর হবে। এসব প্রকল্পের আওতায় TSC কমপ্লেক্স, ১০ তলা ছাত্রী হল, তিনটি একাডেমিক ভবন, তিনটি গবেষণা কমপ্লেক্স, সিনেট ভবন, প্রশাসনিক ভবন, সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, গ্রাউন্ড ওয়াটার রিজার্ভার, এসটিপি ও বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের আরও একটি বড় উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা জানান উপাচার্য। এর আওতায় ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য ১০টি ১০ তলা আবাসিক হল, বিদেশি শিক্ষার্থী ও পিএইচডি-এমফিল গবেষকদের জন্য একটি হল, চারটি একাডেমিক ভবন, ব্লু-ইকোনমি রিসার্চ সেন্টার, কেন্দ্রীয় জাদুঘর, গ্রন্থাগারের দ্বিতীয় ভবন, স্টেডিয়াম, সুইমিং পুল, আধুনিক গবেষণাগার, ৫০ শয্যার হাসপাতাল, ডে-কেয়ার সেন্টার, টিচার্স ডরমিটরি, ওয়াকওয়ে, ফুড কোর্টসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সভায় উপাচার্য আরও জানান, বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ইউজিসি বাস্তবায়নাধীন Higher Education Acceleration and Transformation (HEAT) প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৯ কোটি ৭৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা ব্যয়ে আটটি সাব-প্রকল্প চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ উন্নয়ন, চিকিৎসাসেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উদ্ভাবনী দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় রাউন্ডে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরও ৫২টি প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে।
সেবার আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ওয়াই-ফাই, Internet of Things (IoT) সেন্সরযুক্ত ড্যাশবোর্ড, নিরাপত্তা ক্যামেরা ও রিয়েল-টাইম তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা চালুর প্রক্রিয়া চলছে। পরীক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রমও অটোমেশনের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়ন ও ৫০ শয্যার মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।
উপাচার্য বলেন, সরকারের ভিশন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) ২০৩০-এর Goal-4 অনুসরণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বর্তমান প্রশাসন কাজ করছে।
সভায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন এবং উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. সফিকুল ইসলাম।
উপাচার্যের বক্তব্য ও বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নেন সিনেট সদস্য ও সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, এরশাদ উল্লাহ, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও সাঈদ আল নোমান। এ সময় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানও উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীনসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, গবেষক এবং সিনেট সদস্যরা আলোচনায় অংশ নেন।
সিনেট সভার শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। পরে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করা হয়। গত সিনেট সভার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্য ও বিশিষ্টজনদের মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের স্মরণে নীরবতা পালন, দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব