টাঙ্গাইল প্রতিনিধি: টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে চাঁদা না দেওয়ায় জুটমিলের ম্যানেজারকে হত্যার হুমকি দেওয়ার পর আতঙ্কে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের স্বজন ও মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, চাঁদাবাজদের হুমকির কারণে আতঙ্কিত হয়ে ম্যানেজার মো. সাজিদুর রহমান ওরফে শাহজাহান (৫৫) অসুস্থ হয়ে মারা গেলেও পুলিশ বিষয়টি মৃত্যুর ঘটনা হিসেবে তদন্ত না করে শুধু চাঁদাবাজির ধারায় মামলা করেছে। এছাড়া ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
গত সোমবার (২৪ আগস্ট) সন্ধ্যায় ভূঞাপুর থানাধীন সারপলশিয়া মৌজায় অবস্থিত ‘ফুড অফিসার্স যমুনা জুট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ কোম্পানিতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত সাজিদুর রহমান ওরফে শাহজাহান ভূঞাপুর উপজেলার ভারই গ্রামের সাবেক পোস্টমাস্টার মৃত হাসান আলীর ছেলে।
মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে উৎপাদনে আসা জুটমিলটির ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন সাজিদুর রহমান। দীর্ঘদিন ধরে পাথাইলকান্দি গ্রামের আসলামের ছেলে ওয়ারেস (২৫), সারপলশিয়া গ্রামের বাছেদের ছেলে মো. শামীম (৩০) এবং পাথাইলকান্দি গ্রামের মৃত আব্দুল হাই তালুকদারের ছেলে মো. লিখন (৩০) বিভিন্ন সময় সরাসরি ও মোবাইল ফোনে তাঁর কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২২ আগস্ট শনিবার সন্ধ্যায় অভিযুক্তরা কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে জুটমিলে প্রবেশ করে ম্যানেজারের সঙ্গে অসদাচরণ করেন এবং ২৪ আগস্টের মধ্যে চাঁদা না দিলে তাঁকে হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকি দেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ সময় মিলের সুপারভাইজার মো. আক্তার হোসেন, প্রোডাকশন ম্যানেজার মো. রমজান আলী, হিসাবরক্ষক মো. ইয়াসিন আরাফাতসহ কর্মকর্তারা অভিযুক্তদের চলে যেতে অনুরোধ করলেও তাঁরা চলে যেতে চাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে চাঁদার দাবিতে দেওয়া হুমকিতে ম্যানেজার সাজিদুর রহমান আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বলে মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান।
পরবর্তীতে সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে অভিযুক্তরা মোটরসাইকেলে করে আবারও জুটমিলে প্রবেশ করে ম্যানেজারকে খুঁজতে থাকেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ খবর পেয়ে পূর্বের হুমকিতে আতঙ্কিত সাজিদুর রহমান মিলের ভেতরেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁকে উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের আকস্মিক মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত না করিয়ে মরদেহ দাফনের অনুমতি দেওয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মিলের সহকারী প্রোডাকশন ইনচার্জ ফরিদুল ইসলাম, ফেরদৌস ওয়াহিদসহ কয়েকজন শ্রমিকের অভিযোগ, ওয়ারেস, শামীম ও লিখনদের হুমকির কারণেই ম্যানেজার আতঙ্কিত হয়ে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।
মামলার বাদী ও মিলের সুপারভাইজার মো. আক্তার হোসেন বলেন, জুটমিলে প্রায় ৫০০ শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের সমস্যা ছিল না। হঠাৎ ওয়ারেস, শামীম, লিখনসহ ৫-৬ জন চাঁদা দাবি শুরু করেন। তাঁদের হুমকিতে ম্যানেজার আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত মিলের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে মারা যান।
তিনি বলেন, এজাহারে ম্যানেজারের মৃত্যুর বিষয়টি উল্লেখ থাকার পরও পুলিশ শুধু সাধারণ চাঁদাবাজির ধারায় মামলা করেছে। তাঁর দাবি, মৃত্যুর ঘটনাটিও যথাযথভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন ছিল।
এ ঘটনায় ভূঞাপুর থানায় ২৬ আগস্ট মামলা নম্বর-২০ হিসেবে ১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/৩৮৫/৫০৬ ধারায় মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।
তবে স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, জুটমিলের ট্রাক চলাচলের জন্য বালু ব্যবসায়ীদের তৈরি করা একটি রাস্তা ব্যবহারের বিষয় নিয়ে ওয়ারেস, শামীম, লিখনসহ কয়েকজন ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন। তাঁদের মতে, সেখানে চাঁদাবাজির বিষয় ছিল না।
নিকরাইল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন মন্ডল বলেন, জুটমিলের ম্যানেজার আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন এবং স্ট্রোক করে মারা গেছেন বলে তিনি জানেন। পাওনা টাকা নিয়ে তাঁর সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়েছিল; তবে চাঁদাবাজির কোনো বিষয় সম্পর্কে তিনি অবগত নন।
ভূঞাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম রেজাউল করিম বলেন, জুটমিলের ঘটনায় চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা করা হয়েছে। ম্যানেজার স্ট্রোক করে মারা গেছেন। চাঁদা দাবিকারীদের সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনো সম্পৃক্ততা থাকলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ময়নাতদন্ত না করার বিষয়ে ওসি বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে ময়নাতদন্ত করতে দেওয়া হয়নি। স্ট্রোক করে মৃত্যু হওয়ায় মরদেহ পারিবারিকভাবে ধর্মীয় রীতিতে দাফন করা হয়েছে।
এদিকে, মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয়দের একাংশ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, চাঁদা দাবির হুমকির পর একজন মানুষের আকস্মিক মৃত্যুর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব