রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় তালাবদ্ধ একটি কক্ষ থেকে দম্পতি ও নবজাতকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তিন দিনের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয় (৪৪) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পিবিআইয়ের দাবি, নিহত নারী নাজমা খাতুনের সঙ্গে হৃদয়ের পূর্বপরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ওই সম্পর্ককে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে একপর্যায়ে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।
গ্রেপ্তারের পর হৃদয়ের কাছ থেকে নিহত নাজমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও হ্যান্ডব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। পিবিআই জানিয়েছে, পরে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন হৃদয়।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর উত্তরা এলাকায় পিবিআই ঢাকা জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ।
তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে উদ্ধার তিন মরদেহ
পিবিআই জানায়, গত ৫ সেপ্টেম্বর আশুলিয়া থানার জামগড়া এলাকায় হযরত আলীর বাড়ির দ্বিতীয় তলার ৫৬ নম্বর কক্ষ থেকে পচা দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। বিষয়টি টের পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন।
পরে আশুলিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তালাবদ্ধ কক্ষের দরজা খুলে শয়নকক্ষের ভেতর থেকে অর্ধগলিত এক পুরুষ, এক নারী ও একটি নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার করে।
নিহতরা হলেন আলমগীর কবির (৪৫), তার স্ত্রী নাজমা খাতুন (৩৯) এবং সদ্য ভূমিষ্ঠ একটি নবজাতক। আলমগীরের বাবার নাম অচুমদ্দিন। তার বাড়ি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার নিশা কাজলদীঘি এলাকায়। নাজমার স্বামীর বাড়িও একই উপজেলার বড় মাগুরা এলাকায়।
মরদেহ উদ্ধারের পর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় নিহত নাজমার বড় বোন শাপলা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় মামলা করেন। গত ৬ সেপ্টেম্বর করা মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
তিন দিনের তদন্তে গ্রেপ্তার হৃদয়
মামলা হওয়ার পর থেকেই পিবিআই ঢাকা জেলা ছায়া তদন্ত শুরু করে। পরে মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় ৮ সেপ্টেম্বর স্বউদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে সংস্থাটি। মামলাটির তদন্ত করছেন পিবিআই ঢাকা জেলার উপপরিদর্শক আনিসুর রহমান।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ৮ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকা থেকে মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয়কে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআইয়ের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে হৃদয় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। পরে তাঁর দেওয়া তথ্য ও দেখানো মতে ভাড়া বাসা থেকে নাজমার ব্যবহৃত অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও হ্যান্ডব্যাগ উদ্ধার করা হয়।
এরপর হৃদয়কে আদালতে হাজির করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
যেভাবে ঘটে হত্যাকাণ্ড
পিবিআইয়ের তদন্ত এবং আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ জানান, মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয়ের সঙ্গে নিহত আলমগীরের পূর্বপরিচয় ছিল। আলমগীর বেকার ছিলেন এবং হৃদয় তরকারির ব্যবসা করতেন। তাদের বাসার দূরত্ব ছিল প্রায় ১০ মিনিটের হাঁটার পথ।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের আগে থেকেই নাজমার সঙ্গে হৃদয়ের প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি জানতে পেরে আলমগীরের সঙ্গে হৃদয়ের বিরোধ তৈরি হয়।
ঘটনার দিন নাজমা ও আলমগীর হৃদয়ের বাসায় গিয়ে তাঁকে নিজেদের বাসায় নিয়ে আসেন। সেখানে আগের সম্পর্কের বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়।
একপর্যায়ে আলমগীর হৃদয়ের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করেন এবং তাঁকে মারধর করতে থাকেন। এ সময় নাজমাও হৃদয়কে ঝাঁটা দিয়ে আঘাত করেন বলে পিবিআই জানিয়েছে।
পুলিশের দাবি, তখন হৃদয়ও ধাক্কাধাক্কি ও ঘুষি দিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তিনি নাজমার পেটে লাথি মারলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। হৃদয়ের স্বীকারোক্তির বরাতে পিবিআই জানিয়েছে, এতে নাজমার পেটে গুরুতর আঘাত লাগে এবং তিনি ও তাঁর গর্ভের সন্তান মারা যান।
এরপর আলমগীর খুন্তি ও পাইপ দিয়ে হৃদয়কে আঘাত করেন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে হৃদয় আলমগীরের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন বলে পিবিআই জানিয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর হৃদয় মরদেহগুলো খাটের ওপর শুইয়ে রেখে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। যাওয়ার সময় তিনি নাজমার মোবাইল ফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে যান বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
আগের হত্যা মামলাতেও অভিযুক্ত হৃদয়
গ্রেপ্তার মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয়ের অপরাধের ইতিহাস যাচাই করে পিবিআই জানিয়েছে, এর আগেও একটি হত্যা মামলায় তিনি অভিযুক্ত ছিলেন।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর আশুলিয়া থানায় করা ৫৮ নম্বর মামলায় তাঁকে সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ওই মামলায় আশুলিয়া থানার গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের কাছাকাছি একটি স্থান থেকে অজ্ঞাতনামা এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।
তদন্তে ওই ঘটনায় ধর্ষণের আলামত পাওয়ার কথা জানিয়ে পিবিআই বলেছে, হত্যা মামলার পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারাও যুক্ত করা হয়।
তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ৩১ জুলাই আশুলিয়া থানার চার্জশিট নম্বর ৫২৪-এর মাধ্যমে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ওই মামলায় মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পিবিআই। একই মামলায় অপ্রাপ্তবয়স্ক সাব্বির ইসলাম (১৫) নামের একজনের বিরুদ্ধেও দোষীপত্র দেওয়া হয়েছিল।
অন্য কেউ জড়িত কি না খতিয়ে দেখছে পিবিআই
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ বলেন, হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর থেকেই পিবিআই ছায়া তদন্ত শুরু করে। ভুক্তভোগীদের পূর্বপরিচিত ব্যক্তি, তাদের সম্পর্ক এবং চলাফেরার তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়।
তিনি বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হৃদয়কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার রহস্য উন্মোচনের পাশাপাশি আসামিকে গ্রেপ্তার এবং আলামত উদ্ধারে পিবিআই সক্ষম হয়েছে।
পুলিশ সুপার আরও জানান, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
রিপোর্টার্স২৪/ঝুম