নুসরাত জাহান কিন্নরী:
ইতিহাসের কিছু মানুষ শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়কে ঘিরে আঁকড়ে থাকে না। তাদের চিন্তা, রাজনৈতিক আদর্শ এবং কর্মধারা পরবর্তী সমাজে, ব্যবস্থা, মানুষ, রাষ্ট্রচিন্তা, ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করে বারংবার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এমনই একটি অলংকৃত নাম। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ঘিরে তার ভূমিকা আজও নানা বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দেয়।
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রচিন্তা
স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, যে জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশী জনগণের আত্মপরিচয়কে বহন করে। তার চিন্তায় বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাস, নিজস্ব ভূখণ্ড, সংস্কৃতি, সার্বভৌমত্ব, বহু দলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও জাতীয় স্বার্থকে রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের স্বকীয় পরিচয় ও সার্বভৌমত্বকে শক্তিশালী করার প্রশ্ন তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্ব পেয়েছিল।
আত্মনির্ভরতা ও জনগণের অংশগ্রহণ
তার রাষ্ট্রচিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল আত্মনির্ভরতার ধারণা। তিনি মনে করতেন দেশের উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন জনগণ প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করবে এবং দেশের উন্নয়নের জন্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কৃষি, গ্রামীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে তা সরকার অধিক গুরুত্ব দিয়েছিল। তিনি উন্নয়নের সুফলকে শুধু শহরকেন্দ্রিক না রেখে গ্রামীণ জনগণের মাঝেও পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন।
জনকল্যাণমুখী রাজনীতি
জিয়াউর রহমান ছিলেন এমন একজন রাষ্ট্রপতি, যিনি জনসাধারণের সাথে মিশে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে অধিক আনন্দ উপভোগ করতেন। তারই জন্য তিনি মাইলের পর মাইল হেঁটে জনসাধারণের দোরগোড়ায় পৌঁছেছিলেন, তাদের ফলন কেমন হয়, তাদের জীবনযাত্রা কেমন চলছে, সে সকল খোঁজখবর নেওয়ার জন্য। জিয়াউর রহমান জনকল্যাণমুখী রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন।
বহুদলীয় গণতন্ত্র
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক পদচারণায় বহুদলীয় গণতন্ত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। তার শাসনামলে বহু রাজনৈতিক দল তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার অধিক সুযোগ পেয়েছিল, কারণ তিনি চেয়েছিলেন এমন এক গণতন্ত্র, যেখানে সত্যিকারের জনগণের অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতায়ন হবে। তাই তার আমলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর পরিবর্তিত হয় এবং একাধিক রাজনৈতিক দল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গ্রামীণ অগ্রগতি
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তার আমলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদন বাড়ানো, কৃষির উন্নয়ন, সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ, খাল খনন এবং গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করার চেষ্টা করা হয়। তাঁর উন্নয়ন মুখী ভাবনায় রাষ্ট্রের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ ত্বরান্বিত হয়।
পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় স্বার্থ
একটি দেশকে আন্তর্জাতিকভাবে শক্তিশালী করতে হলে পররাষ্ট্রনীতিকে সক্রিয়, বাস্তবমুখী ও শক্তিশালী করতে হয়। পররাষ্ট্রনীতি দ্বারা জাতীয় স্বার্থকে ত্বরান্বিত করতে পারলেই একটি দেশ সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে পথিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বহুমুখী করার এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা তাঁর সময়ের পররাষ্ট্রনীতির একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে আলোচিত হয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরবে জনসম্পদকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে তিনি এগিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান সৌদি আরবের সাথে জনশক্তি রপ্তানি চুক্তি করেছিলেন, যা এই দেশের রেমিড্যান্স এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে অধিক গুরুত্ব বহন করে।
মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ
১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি বাংলাদেশ যখন অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের কঠিন সময় পার করছিল, তখন বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৯৭৬ সালে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে সৌদি আরব সফর করে দেশটির সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা করেন। এই উদ্যোগ পরবর্তীকালে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানির বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করে।
বর্তমান বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের আদর্শের প্রাসঙ্গিকতা
তবে আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে জিয়াউর রহমানের আদর্শের প্রাসঙ্গিকতা কোথায়, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে স্বনির্ভরতা, জাতীয় স্বার্থ, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও জনগণের অংশগ্রহণের মতো বিষয় সামনে আসে। যুগের পরিক্রমায় সময় বদলেছে, বদলেছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো। পাশাপাশি পরিবর্তন এসেছে রাজনৈতিক ভাবনায়। কিন্তু একটি দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে জনগণকে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্তকরণ, স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভর হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান বাংলাদেশের জনগণ নিজস্ব অধিকার, রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের প্রতি যথেষ্ট সচেতন এবং তারা বাস্তবমুখী কল্যাণে বিশ্বাসী।
উপসংহার
তাই আজকের দিনে দাঁড়িয়ে জিয়াউর রহমান শুধু একটি নাম নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অলংকৃত অধ্যায়। তার আদর্শ ও কর্মকাণ্ডকে আবেগের পরিবর্তে যুক্তি, ইতিহাস ও বাস্তবিক ধারায় পর্যবেক্ষণ করে মূল্যায়ন করাই হতে পারে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শকে বোঝার সবচেয়ে কার্যকর পথ। সময়ের সীমানা পেরিয়ে জিয়াউর রহমানের আদর্শ প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকে এবং নতুন প্রজন্মের মুখোমুখি হয়ে নতুনভাবে ধরা দেয়।
লেখক: নুসরাত জাহান কিন্নরী (সহছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল)
শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়