| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

৫৬ বছরের সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত: এক আঙিনায় মসজিদ-মন্দির, আজানে থামে ঢাকের বোল

reporter
  • আপডেট টাইম: অক্টোবর ১৯, ২০২৬ ইং | ২১:৫৪:৩৮:অপরাহ্ন  |  ১০৬৬ বার পঠিত
৫৬ বছরের সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত: এক আঙিনায় মসজিদ-মন্দির, আজানে থামে ঢাকের বোল

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি: একই সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। একদিকে দুর্গাপূজার ঢাকের বোল, শঙ্খধ্বনি আর ধূপের সুবাস; অন্যদিকে মসজিদ থেকে ভেসে আসে পবিত্র আজানের সুর। আজান শুরু হলেই থেমে যায় মন্দিরের ঢাক-ঢোলসহ সব বাদ্যযন্ত্র। কোনো লিখিত নির্দেশনা ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার মধ্য দিয়ে চলে আসছে এই রীতি। ধর্মীয় সম্প্রীতির এমন অনন্য দৃষ্টান্ত দেখা গেছে টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলা সদরের চৌধুরী বাড়িতে।

স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, একই প্রাঙ্গণে দুই ধর্মের মানুষের এমন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার উজ্জ্বল প্রতীক। এই দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে পড়ুক দেশজুড়ে—এমন প্রত্যাশা তাঁদের।

সরেজমিনে জানা যায়, নাগরপুর সদরের চৌধুরী বাড়িতে স্থানীয় শ্রী পরেশ চন্দ্র ও শৈলেশ চন্দ্র প্রথমে দেবী দুর্গার একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কয়েক বছর পর ১৯৬২ সালে একই চত্বরে নির্মিত হয় চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। এরপর থেকে পাশাপাশি অবস্থান করছে দুই উপাসনালয়। সীমানাপ্রাচীরের পশ্চিম পাশে মন্দির এবং পূর্ব পাশে মসজিদ। মসজিদের দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে মুসল্লিদের অজুর ব্যবস্থা।

বর্তমানে শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে মুখর মন্দির প্রাঙ্গণ। বর্ণিল আলোকসজ্জা, ঢাকের বোল আর ভক্তদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হলেও মসজিদের প্রতি সম্মান জানিয়ে আজানের সময় বন্ধ রাখা হয় ঢাক-ঢোল, আতশবাজিসহ সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র ও সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা। দীর্ঘদিন ধরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই রীতি মেনে চলছেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।

চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা হুমায়ুন কবির বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির নিজ নিজ ধর্মীয় মর্যাদায় টিকে আছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মন্দিরে পূজা করেন, আর মুসলমানরা মসজিদে নামাজ আদায় করেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের কারণে ধর্মীয় আচার পালনে কেউ কাউকে বাধা দেন না। এ পর্যন্ত কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি, কাউকে আলাদাভাবে সতর্ক করারও প্রয়োজন হয়নি।

পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ঝন্টু কুমার সাহা বলেন, ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্নে উদ্‌যাপনে স্থানীয় মুসলমান ভাইয়েরা আন্তরিক সহযোগিতা করেন। তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার যে সম্পর্ক রয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। নাগরপুরের এই দৃষ্টান্ত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় হবে।

জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবার টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় মোট ১ হাজার ৩৫৭টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে মির্জাপুর উপজেলায় সর্বোচ্চ ২৭০টি এবং দেলদুয়ার উপজেলায় সর্বনিম্ন ৩৪টি মণ্ডপ রয়েছে। ব্যতিক্রমী সহাবস্থানের কারণে নাগরপুরের চৌধুরী বাড়ির মন্দিরটি জেলার অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।

নাগরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিখন বণিক বলেন, বাংলাদেশ আবহমানকাল থেকেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। নাগরপুরের চৌধুরী বাড়ি তার জীবন্ত উদাহরণ। একই প্রাঙ্গণে মুসলমানরা নামাজ আদায় করছেন, আর হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পূজা উদ্‌যাপন করছেন। বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় এবারও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার বলেন, জেলার ১ হাজার ৩৫৭টি পূজামণ্ডপে উৎসব নির্বিঘ্ন করতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। নাগরপুরের চৌধুরী বাড়িতে মসজিদ ও মন্দিরের সহাবস্থান বিরল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। সেখানে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। তবে জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে।

টাঙ্গাইল-৬ (দেলদুয়ার-নাগরপুর) আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল আওয়াল লাভলু বলেন, “এই মাটিতে ‘সংখ্যালঘু’ বলে কোনো শব্দ নেই, আমরা সবাই এ দেশের নাগরিক। প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে ও মর্যাদার সঙ্গে পালন করবেন—এটাই আমাদের ঐতিহ্য।”

তিনি আরও বলেন, একই আঙিনায় পূজার্চনা ও নামাজ আদায়ের এই দৃশ্য বাংলাদেশের হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণ সর্বাত্মক তৎপর রয়েছেন।

​রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪